প্রতিনিধি ৬ মে ২০২৬ , ১:২০:৩৯ প্রিন্ট সংস্করণ

চট্টবাণী: প্রতিবছর এপ্রিল ও মে মাসে মা-মাছ ডিম ছাড়ে। এ সময়টা হালদা পাড়ের মানুষদের জন্য অনেক আনন্দের।আগ্রহ আর উদ্দীপনার শেষ থাকে না ডিম সংগ্রহকারীদের। কখন মা-মাছ ডিম ছাড়বে সেই অপেক্ষায় থাকেন তাঁরা।
হালদাপাড়েই বেশি সময় কাটে ডিম সংগ্রহকরীদের। এখানে রুই, কাতলা, মৃগেল, কালিবাউশ মাছের নিষিক্ত ডিম আহরণ করেন জেলেরা।
এরপর সেই ডিম কুয়াতে রেণু করা হয়। তারপর রেণু থেকে তৈরি হয় পোনা।
হালদার প্রাকৃতিক মাছের পোনা দ্রুত বড় হওয়ায় মাছচাষিদের কাছে কদর বেশি। হালদার এই ‘সাদা সোনা’ ঘিরে চলে কোটি টাকার বাণিজ্য।
এ নদী থেকে বৃহস্পতিবার (৩০ এপ্রিল) দিবাগত রাতে আহরিত ডিম থেকে রেণু ফোটাতে ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছে ডিম আহরণকারীরা। কয়েক ঘণ্টা পর পর কুয়ার পানি পরিবর্তন করে সনাতনী পদ্ধতিতে ডিম থেকে রেণু বা পোনায় রুপান্তরিত করতে হয়।
মঙ্গলবার (৫ মে) থেকে সেই পোনা বিক্রি পুরোদমে শুরু হয়েছে বলে জানিয়েছেন ডিম সংগ্রহকারী ও মৎস্য কর্মকর্তারা। এরআগে সোমবার দুপুরের দিকে কিছু পরিমাণ পোনা বিক্রি হয়। এ পোনা বিক্রি প্রায় আগামী এক সপ্তাহ ধরে চলবে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
তারা বলছেন, প্রতি কেজি পোনার বর্তমান বাজার মূল্য ১ লাখ ২০ হাজার থেকে ১ লাখ ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত বিক্রি হয়। পোনার গুণগতমান, পানির পরিমাণ সব মিলিয়ে পোনার দাম আরও বাড়তি হতে পারে। এবার প্রায় ২ কোটি টাকার পোনা বাণিজ্য হবে বলে প্রত্যাশা সংশ্লিষ্ট মৎস্য অধিদপ্তরের। ইতোমধ্যে দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে ক্রেতারা হ্যাচারিগুলোতে আসা শুরু করেছেন।
জানা গেছে, নদীতে মা মাছ গত বৃহস্পতিবার ডিম ছাড়ে। সকাল ১০টার দিকে নমুনা ডিম ছাড়ে, আবার একই দিন দুপুর দেড়টা দুইটার দিকে ২য় দফা এবং রাত দুইটার দিকে পুনরায় ডিম ছেড়েছে বলে জানিয়েছেন ডিম সংগ্রহকারীরা। উপজেলা প্রশাসন ও মৎস্য বিভাগ এবার পূর্ণিমার প্রথম জো/ তিথিতে প্রায় সাড়ে আড়াইশ’ নৌকায় ৫ শতাধিক ডিম সংগ্রহকারী ৬ হাজার কেজি ডিম আহরণ করেছেন।
বৈশাখ মাসে চলমান পূর্ণিমা তিথিতে নদীতে মাছ তিন দফা ডিম ছেড়েছে। নদীর অংকুরী ঘোনা, গড়দুয়ারায় নয়াহাট, সিপাহির ঘাট, পাতাইজ্জ্যার টেক, কাগতিয়ার টেক, সোনাইর মুখ, মাছুয়াঘোনা, আজিমারঘাট, নাপিতেরঘাট, আমতুয়া কুমারখালির টেক, বারিয়াঘোনা, রমদাশমুন্সিরহাট, মদুনাঘাট প্রভৃতি এলাকায় ডিম ছাড়ার খবর নিশ্চিত করেছেন ডিম সংগ্রহকারীরা। কয়দিন থেকে কাল বৈশাখীর দমকা হাওয়া, বজ্রসহ বৃষ্টিপাত, নদীতে, পাহাড়ী ঢলের প্রকোপ, অপেক্ষাকৃত শীতল পরিবেশ মাছের ডিম ছাড়ার উপযোগী। তাই উপযুক্ত পরিবেশ পেয়ে পূর্ণিমার জো-তে মাছ ডিম ছেড়েছে।
এদিকে হালদা নদী থেকে আহরিত ডিম থেকে হাটহাজারী অংশে মদুনাঘাট হ্যাচারি শাহ মাদারি এবং মাছুয়াঘোনা হ্যাচারিকে পুরোদমে প্রস্তুত রাখা হয়েছিল। তিনটি হ্যাচারিতে যথাক্রমে মাছুয়াঘোনা হ্যাচারিতে ৪৬টি কুয়া, শাহ মাদারিতে ৪৫টি এবং মদুনাঘাটে ১৮টি কুয়া পাশাপাশি গড়দুয়ারা ও বারিয়াঘোনায় ৩০টি মাটির কুয়া প্রস্তুত ছিল ডিম থেকে রেণু ফোটাতে। শাহ মাদারিতে ২৫ গ্রুপ, মাছুয়োঘোনাতে ২৬ এবং মদুনাঘাটে ২০টি গ্রুপ সহ পাঁচশ’র অধিক ডিম সংগ্রহকারী ব্যস্ত সময় পার করছেন।
মৎস্য কর্মকর্তার তথ্যমতে, এক হাজার ৯২০ কেজি, মদুনাঘাট হ্যাচারিতে ৮০০ কেজি মাছুয়াঘোনা হ্যাচারিতে ৯৭০ কেজি, বাড়িঘোনা মাটির কুয়াতে ৬৫০ কেজি, কামাল সদাগর ১২০ কেজি, আইডিএফ মাটির কুয়াতে ৫৯০ কেজি, এছাড়া রাউজান উপজেলার সরকারি হ্যাচারি মোবারকখীলে ৩৯০ কেজিসহ মোট ৪ হাজার ৮৫০ কেজি এবং ব্যক্তিগতভাবেও মাটির কুয়াতে কয়েকজন ডিম সংগ্রহ করেছেন। প্রতিবছরের ন্যায় এবছর আইডিএফ হালদা গবেষণা ও প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে মোট ৯টি গ্রুপে ৪৮ জন ডিম সংগ্রহকারী ২৪টি নৌকা নিয়ে প্রায় ৫৯০ কেজি (৫৯ বালতি) ডিম সংগ্রহ করে হ্যাচিং ট্যাংকে মজুত করেন। আইডিএফ হ্যাচারি ব্যবস্থাপক আশা করছেন, এবছর প্রায় ১৪ দশমিক ১৩ কেজি রেণু উৎপাদিত হবে।
হালদা গবেষক অধ্যাপক ড. মনজুরুল কিবরীয়া বলেন, ৩০ এপ্রিল প্রথমবার পূর্ণিমার জো-তে তিন দফায় ৬ হাজার কেজি ডিম আহরণ করা হয়েছে। এবার আড়াইশ’ নৌকায় পাঁচ শতাধিক ডিম সংগ্রহকারী নদী থেকে ডিম সংগ্রহ করেছেন। এছাড়া আরও তিনটি জো রয়েছে। আগামী ১৪ মে থেকে ১৯ মে শুরু হওয়া অমাবস্যার জো-তে অনুকূল পরিবেশ থাকলে কার্পজাতীয় মা মাছ আবার ডিম ছাড়াতে পারে।
জেলা মৎস্য কর্মকর্তার সালমা বেগম বলেন, গত বৃহস্পতিবার দিবাগত রাতে আহরিত ডিম থেকে রেণু ফোটাতে ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছে ডিম আহরণকারীরা। আমাদের মৎস কর্মকর্তারাও সেখানে নিরলসভাবে কাজ করছেন। এখন পর্যন্ত কত কেজি ডিম সংগ্রহ করা হয়েছে। সেখান থেকে কত কেজি পোনা ফোটানো হয়েছে এসব তথ্যগুলো আমাদের মন্ত্রণালয় থেকে জানাবে।
তিনি আরও বলেন, হ্যাচারিতে প্রতিকেজি ১ লাখ ২০ হাজার করে পোনা বিক্রি হয়েছে। যা দেড় থেকে দুই কোটি টাকার লেনদেন ছড়িয়ে যাবে। আমরা আশাবাদী সামনের আমাবস্যা ও পূর্ণিমার জো-তে আবার ডিম পাবো।
ডিম সংগ্রহকারী রওশনগীর আলম বলেন, এ দুই মাস ডিম ছাড়ার ভর মৌসুম। তাই বংশ পরম্পরায় অভিজ্ঞ হালদাপাড়ের ডিম সংগ্রহকারীদের ব্যস্ততার সীমা নেই। চলছে নানান কর্মযজ্ঞ। আজ থেকে পোনা বিক্রি শুরু হয়েছে।
ডিম সংগ্রহকারী হাটহাজারী উপজেলার গড়দুয়ারার কামাল উদ্দিন বলেন, গতবছর ৩৫ বালতি ডিম আহরণ করেছিলাম। এবার মাত্র ১২ বালতি ডিম আহরণ করতে পেরেছি। সারাদেশ থেকে ক্রেতারা এখানে আসে। এবার আমেরিকা থেকে এক সিলেটি মুঠোফোনে যোগাযোগ করেছে পোনার জন্য। এবার সারাদেশে হালদার পোনার সর্বোচ্চ চাহিদার তুলনায় যোগান কম থাকার কারণে পোনার দাম কেজি প্রতি ১ লাখ ৭০ হাজার থেকে ১ লাখ ৮০ হাজার টাকা পর্যন্ত হতে পারে।