প্রতিনিধি ১৩ জুলাই ২০২৬ , ১২:০৫:৪৮ প্রিন্ট সংস্করণ

শেখ আব্দুল্লাহ,মহেশখালী প্রতিনিধি : কক্সবাজারের মহেশখালী উপজেলার মাতারবাড়ী ইউনিয়নকে একসময় উন্নয়নের প্রতীক হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। দেশের বৃহৎ বিদ্যুৎকেন্দ্র, গভীর সমুদ্রবন্দর, অর্থনৈতিক অঞ্চলসহ একের পর এক মেগা প্রকল্পের কারণে এলাকাটি এখন “সিঙ্গাপুর খ্যাত মাতারবাড়ী” নামে পরিচিত। অথচ সেই মাতারবাড়ীরই হাজারো সাধারণ মানুষের জীবন আজও রয়ে গেছে চরম ঝুঁকি ও অনিশ্চয়তার মধ্যে।
গত রবিবারর ৫ জুলাই থেকে শুরু হওয়া টানা ভারি বর্ষণ এবং জোয়ারের প্রভাবে মাতারবাড়ী ইউনিয়নের সাইরার ডেইলসহ বেড়িবাঁধ সংলগ্ন বিস্তীর্ণ এলাকা পানিতে তলিয়ে গেছে। অন্তত ৫০০ পরিবার পানিবন্দি হয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছে। অনেক বাড়িতে হাঁটু থেকে কোমরসমান পানি জমে রয়েছে। রান্নাঘর, শয়নকক্ষ, উঠান—সবই পানির নিচে চলে গেছে। নষ্ট হয়ে যাচ্ছে খাদ্যসামগ্রী, গবাদিপশুর খাবার এবং ঘরের প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, উপকূলীয় বেড়িবাঁধের একাধিক স্থানে ভয়াবহ ভাঙন সৃষ্টি হয়েছে। উত্তাল ঢেউয়ের আঘাতে বাড়ির একেবারে পাশের মাটি সরে গেছে। কোথাও বিশাল গাছ উপড়ে পড়েছে, কোথাও ঘরের দেয়াল ধসে পড়েছে। অনেক পরিবার ঘর ছেড়ে নিরাপদ স্থানে আশ্রয়ের প্রস্তুতি নিচ্ছে। প্রতিটি জোয়ারের সঙ্গে বাড়ছে আতঙ্ক।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, শিশু, বয়স্ক, অসুস্থ ব্যক্তি ও নারীরা সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগে পড়েছেন। বিশুদ্ধ পানির সংকট দেখা দিয়েছে। অনেকেই রান্না করতে পারছেন না। ঘরে পানি থাকায় স্বাভাবিক জীবনযাত্রা সম্পূর্ণ ব্যাহত হয়েছে।
এলাকাবাসীর অভিযোগ, এটি কোনো একদিনের প্রাকৃতিক দুর্যোগের ফল নয়। বছরের পর বছর ধরে উপকূল রক্ষায় কার্যকর ব্যবস্থা না নেওয়া, বেড়িবাঁধের দুর্বল অবস্থা এবং অপরিকল্পিত উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের কারণে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে উঠেছে।
স্থানীয়দের দাবি, চলমান সড়ক নির্মাণকাজ দীর্ঘদিন ধরে অসমাপ্ত অবস্থায় পড়ে রয়েছে। অনেক স্থানে পানি চলাচলের স্বাভাবিক পথ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় সামান্য বৃষ্টি ও জোয়ারেই পুরো এলাকা জলাবদ্ধ হয়ে পড়ে। উন্নয়নের নামে এমন কাজ মানুষের দুর্ভোগ আরও বাড়িয়ে দিয়েছে বলে অভিযোগ তাদের।
ক্ষোভ প্রকাশ করে কয়েকজন বাসিন্দা বলেন, নির্বাচনের সময় জনপ্রতিনিধিরা ঘরে ঘরে গিয়ে উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি দেন। মানুষের পাশে থাকার অঙ্গীকার করেন। কিন্তু দুর্যোগের এই সময়ে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের পাশে তাদের তেমন উপস্থিতি দেখা যাচ্ছে না। মানুষের কান্নার সময় যদি নেতৃত্ব নীরব থাকে, তাহলে সেই নীরবতা মানুষের হতাশাকে আরও গভীর করে।
স্থানীয়রা বলেন, মাতারবাড়ীতে হাজার হাজার কোটি টাকার উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়িত হলেও সাধারণ মানুষের মৌলিক নিরাপত্তা এখনও নিশ্চিত হয়নি। একটি টেকসই বেড়িবাঁধ, কার্যকর পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা এবং নিরাপদ বসবাসের পরিবেশ আজও তাদের অধরা।
তারা বলেন, যুগের পরিবর্তন হয়, সরকার পরিবর্তন হয়; কিন্তু মাতারবাড়ীর মানুষের ন্যায্য অধিকার যেন আর পূরণ হয় না। উন্নয়নের আলো চারদিকে ছড়িয়ে পড়লেও আমাদের ঘরে এখনও পানি ঢোকে, ভাঙনে ভিটেমাটি হারানোর ভয় থাকে।
এলাকাবাসী অবিলম্বে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর পাশে দাঁড়ানো, জরুরি ত্রাণ সহায়তা প্রদান, উপকূল রক্ষা বেড়িবাঁধের স্থায়ী সংস্কার, জলাবদ্ধতা নিরসনে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ এবং চলমান উন্নয়নকাজ দ্রুত ও পরিকল্পিতভাবে শেষ করার জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের প্রতি জোর দাবি জানিয়েছেন। তাদের প্রত্যাশা, উন্নয়নের সুফল শুধু বড় প্রকল্পেই সীমাবদ্ধ থাকবে না; মাতারবাড়ীর সাধারণ মানুষের নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ জীবন নিশ্চিত করতেও সমান গুরুত্ব দেওয়া হবে।
এ বিষয়ে মহেশখালী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ইমরান মাহমুদ ডালিম বলেন, টানা বর্ষণে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে সরেজমিনে পরিদর্শন করা হচ্ছে। দুর্গত মানুষের জন্য প্রয়োজনীয় সহযোগিতা অব্যাহত রয়েছে। পাশাপাশি উপকূল রক্ষায় বেড়িবাঁধের কার্যক্রমও প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।
এদিকে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাবাসীর প্রত্যাশা, চলমান ত্রাণ কার্যক্রমের পাশাপাশি বেড়িবাঁধ নির্মাণ ও সংস্কারের কাজ দ্রুত বাস্তবায়ন করা হবে। তাদের মতে, মাতারবাড়ীর মতো জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় মানুষের জীবন ও সম্পদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে স্থায়ী ও কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া এখন সময়ের দাবি।