প্রতিনিধি ১০ জুলাই ২০২৬ , ১১:৫৯:৫৪ প্রিন্ট সংস্করণ

শেখ আব্দুল্লাহ, মহেশখালী: টানা কয়েক দিনের বৈরী আবহাওয়া, অবিরাম বর্ষণ এবং ৩ নম্বর স্থানীয় সতর্ক সংকেতের প্রভাবে কক্সবাজারের দ্বীপ উপজেলা মহেশখালী ও কুতুবদিয়ার জনজীবন কার্যত স্থবির হয়ে পড়েছে। পাহাড়ধস, জলাবদ্ধতা, বিদ্যুৎ বিপর্যয়, শিশুর মৃত্যু এবং টানা তিনদিন নৌযান চলাচল বন্ধ থাকায় দুই উপজেলার লাখো মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছে।
টানা চারদিন ধরে মহেশখালী-কক্সবাজার ও কুতুবদিয়া নৌরুটে সি-ট্রাকসহ বিভিন্ন নৌযান চলাচল বন্ধ রয়েছে। ফলে জেলা সদরের সঙ্গে যোগাযোগ কার্যত বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। শত শত যাত্রী, চাকরিজীবী, ব্যবসায়ী, শিক্ষার্থী ও জরুরি চিকিৎসাপ্রার্থী চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন।
এদিকে টানা ভারী বর্ষণে মহেশখালীর কালারমারছড়া, শাপলাপুর, হোয়ানক ও ছোট মহেশখালী ইউনিয়নের বিভিন্ন এলাকায় পাহাড়ধসের ঘটনা ঘটেছে। এতে অন্তত ১০টি বসতবাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং অন্তত ৭ জন আহত হয়েছেন।
বুধবার কালারমারছড়া ইউনিয়নের চালিয়াতলী এলাকার শিকড়তলী গ্রামে পাহাড়ধসে তিনটি বাড়ির একাংশ ধসে পড়ে। এতে নারী-পুরুষসহ তিনজন আহত হন। স্থানীয়দের সহায়তায় তাদের উদ্ধার করে প্রথমে বদরখালী জেনারেল হাসপাতালে এবং পরে উন্নত চিকিৎসার জন্য চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়। বৃহস্পতিবার ভোরে শাপলাপুর, হোয়ানক ও কালারমারছড়ার বড়ুয়া পাড়ায় আরও কয়েকটি পাহাড়ধসে বাড়িঘর ও আসবাবপত্রের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয় এবং আরও চারজন আহত হন।
মহেশখালী ফায়ার সার্ভিস ও উপজেলা প্রশাসন ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যক্রম পরিচালনা করছে। ইতোমধ্যে মাতারবাড়ি ও ধলঘাটা ইউনিয়নের পানিবন্দী পরিবারের মাঝে খাদ্য সহায়তা বিতরণ করা হয়েছে। কালারমারছড়ার ইউনুছখালী এলাকায় গাছ পড়ে ক্ষতিগ্রস্ত একটি পরিবারকে নগদ অর্থ ও ত্রাণ সহায়তা দেওয়া হয়েছে।
এছাড়া মহেশখালী পৌরসভার খালেদ বিন ওয়ালিদ মাদ্রাসার পশ্চিম পাশে নির্মিত একটি বাঁধের কারণে সৃষ্ট জলাবদ্ধতা নিরসনে প্রশাসন প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করে। বাঁধ কেটে দেওয়ার ফলে পৌরসভা ও জাগিরাঘোনা এলাকার জমে থাকা পানি দ্রুত নিষ্কাশন শুরু হয়েছে।
মঙ্গলবার সকালে কুতুবজোম ইউনিয়নের সোনাদিয়া পূর্বপাড়ায় অতিবৃষ্টিতে জমে থাকা পানির গর্তে পড়ে রুমাইসা খানম (২১ মাস) নামে এক শিশুর মর্মান্তিক মৃত্যু হয়। পরিবারের সদস্যরা তাকে উদ্ধার করে কক্সবাজার সদর হাসপাতালে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন।
অন্যদিকে, বৈরী আবহাওয়ার কারণে মাতারবাড়ি গ্রিড থেকে গোরকঘাটা ৩৩ কেভি সঞ্চালন লাইনের স্কাই-ওয়ার ছিঁড়ে যাওয়ায় মহেশখালীর বিভিন্ন এলাকায় বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যাহত হয়েছে। বিদ্যুৎ বিভাগের কর্মীরা ত্রুটি শনাক্ত করে মেরামতের কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন।
স্থানীয়দের অভিযোগ, মহেশখালী পৌরসভার ৫ নম্বর ওয়ার্ডে একটি স্থাপনার কারণে একটি কালভার্টের মুখ আংশিক বা সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় ঘোনাপাড়া ও আশপাশের এলাকায় জলাবদ্ধতা তীব্র আকার ধারণ করেছে। এতে বহু বাড়িঘরে পানি ঢুকে মানুষের দুর্ভোগ বেড়েছে। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বক্তব্য পাওয়া গেলে তা পরবর্তীতে যুক্ত করা হবে।
ক্ষতিগ্রস্ত এলাকার বাসিন্দা রকিয়ত উল্লাহ বলেন প্রতিবছর বর্ষা মৌসুমে পাহাড়ধসের আশঙ্কায় আতঙ্কে থাকতে হয়। এবার টানা বৃষ্টিতে কয়েকটি বসতঘর ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় অনেক পরিবার নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে রয়েছে। তারা প্রশাসনের ত্রাণ ও পুনর্বাসন সহায়তা দ্রুত পাওয়ার প্রত্যাশা করছেন।
কক্সবাজার-২ (মহেশখালী-কুতুবদিয়া) আসনের সংসদ সদস্য আলমগীর মুহাম্মদ মাহফুজ উল্লাহ ফরিদ নৌযান চলাচল বন্ধ থাকায় জনদুর্ভোগের বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, জেলা প্রশাসক ও বিআইডব্লিউটিএর দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তার সঙ্গে তিনি কথা বলেছেন। যেখানে ছোট নৌযান চলাচল করছে, সেখানে যাত্রীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করে সি-ট্রাক চলাচল বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করা প্রয়োজন বলে তিনি মনে করেন। বিষয়টি সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের নজরে এনে দ্রুত সমাধানের উদ্যোগ নেওয়ারও আশ্বাস দেন তিনি।
মহেশখালী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ইমরান মাহমুদ ডালিম বলেন, ৩ নম্বর স্থানীয় সতর্ক সংকেতের কারণে বিআইডব্লিউটিএ ও বিআইডব্লিউটিসির সিদ্ধান্ত অনুযায়ী যাত্রীদের নিরাপত্তার স্বার্থে নৌযান চলাচল সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়েছে। তিনি জানান, মহেশখালীতে মোট ৯৬টি ঘূর্ণিঝড় আশ্রয়কেন্দ্র প্রস্তুত রাখা হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় ত্রাণ বিতরণ, উদ্ধার কার্যক্রম ও পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ অব্যাহত রয়েছে। আবহাওয়া স্বাভাবিক হলে দ্রুত নৌযান চলাচল পুনরায় চালুর উদ্যোগ নেওয়া হবে।
জেলা প্রশাসনের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা শাখা জানিয়েছে, সমুদ্রের বৈরী অবস্থা, পাহাড়ধস ও জলাবদ্ধতার ঝুঁকি বিবেচনায় সার্বক্ষণিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। একই সঙ্গে পাহাড়ের পাদদেশে ও ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় বসবাসকারীদের নিরাপদ আশ্রয়কেন্দ্রে চলে যাওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে।
আবহাওয়া অধিদপ্তরের পূর্বাভাস অনুযায়ী, আগামী কয়েকদিন উপকূলীয় এলাকায় ভারী থেকে অতি ভারী বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকতে পারে। এ অবস্থায় জীবন ও সম্পদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করে দ্রুত নৌযান চলাচল স্বাভাবিক করার দাবি জানিয়েছেন মহেশখালী ও কুতুবদিয়ার সাধারণ মানুষ।