প্রতিনিধি ১৯ ডিসেম্বর ২০২৫ , ১০:৪৪:৩৫ প্রিন্ট সংস্করণ

মহেশখালী প্রতিনিধি: বাংলাদেশের একমাত্র পাহাড়ি দ্বীপ মহেশখালীর পরিচিতি যেমন তার প্রকৃতি, তেমনি বহু শতাব্দীর কৃষি ঐতিহ্যের অন্যতম রত্ন—মহেশখালীর মিষ্টি পান। লোকসংগীত, অতিথি আপ্যায়ন, গ্রামীণ সংস্কৃতি,সবকিছুতেই পানের যে বিশেষ মর্যাদা, তারই সবচেয়ে উজ্জ্বল রূপটি পাওয়া যায় এই পাহাড়ি দ্বীপে।
শেফালী ঘোষের হৃদয়ছোঁয়া গান—যদি সুন্দর এখ্যান মুখ পাইতাম, মহিশখাঁলীর পানের খিলি তারে বানাই খাবাইতাম”কেবল একটি সুর নয়,এটি মহেশখালীর মানুষের আবেগ ও ঐতিহ্যের বহমান প্রতীক।
স্থানীয় প্রবীণরা মনে করেন, কমপক্ষে দুইশ’ বছর ধরে মহেশখালীতে সুগন্ধি পানের চাষ চলে আসছে। পাহাড়ি ঢালের বিশেষ মাটি, উপকূলীয় আবহাওয়া এবং অনন্য লবণাক্ত পরিবেশ মিলে মহেশখালীর পানকে দিয়েছে বিশেষ গন্ধ, স্বাদ ও মিষ্টতা।রাজা-মহারাজাদের অতিথি আপ্যায়নে ‘মহেশখালীর খিলি পান’ পরিবেশন করার ইতিহাসও পুরনো দলিলে পাওয়া যায়।
গত দুইদিন গোরকঘাটা ও টাইম বাজারসহ বিভিন্ন এলাকায় ঘুরে দেখা গেছে, শীতের শুরুতেই পানের বাজারে জোয়ার লেগেছে। অনেক চাষি বড় ঝুড়ি ভর্তি পান বিক্রি করে লাখ টাকারও বেশি পাচ্ছেন।
গোরকঘাটা বাজারের পান ব্যবসায়ী সজল কান্তি দে জানান,মাত্র এক সপ্তাহে মাঝারি বিড়ার দাম ৩৪০ টাকা থেকে বেড়ে ৪০০ টাকায় উঠেছে। বাজারে চাপ বেশি, চাহিদাও বেশি।”
মহেশখালীর বড় পান চট্টগ্রাম ও ঢাকায় প্রতি বিড়া ৫০০—৬০০ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হচ্ছে। স্থানীয় বাজারেও ৩৫০—৪০০ টাকার কম নেই।
বড় মহেশখালী, হোয়ানক, ছোট মহেশখালী, শাপলাপুর ও কালারমারছড়ার পাহাড়ি ঢাল ও উপকূলীয় সমতলে বছরজুড়ে পানের চাষ হয়।
পাহাড়ে পানগাছ ২–৩ বছর জীবিত থাকে,সমতলে মৌসুমি চাষ, স্থায়িত্ব ৫–৬ মাস,চাষ শুরু হয় সেপ্টেম্বর–নভেম্বর, শেষ হয় মে মাসে এবং স্থানীয় চাষিদের ভাষায়“মহেশখালীর মাটি নিজেই পানকে মিষ্টি করে।”
মহেশখালীতে সপ্তাহে দুইদিন বসা বিশেষ পানের বাজার, অর্থাৎ পানের টাইম, একসময় ছিল গ্রামের সামাজিক মিলনস্থল। আজও তার ঐতিহ্য অক্ষুণ্ণ।
চাষি, ব্যবসায়ী, দালাল (মধ্যস্বত্বভোগী), শ্রমিক,সবার মিলনে বাজার হয়ে ওঠে উৎসবমুখর।
হোয়ানক টাইম বাজারে গতকাল দেখা যায়,শতাধিক চাষি পান নিয়ে বসেছেন, আর পটিয়া, সাতকানিয়া, চট্টগ্রামসহ দূরদূরান্তের পাইকাররা সরাসরি তাদের কাছ থেকে পান কিনে ট্রাকভর্তি করে নিয়ে যাচ্ছেন দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা আব্দুল গফফার বলেন, মহেশখালীতে প্রায় ৩৫ হাজার পরিবার সরাসরি পানচাষে যুক্ত। উৎপাদন, পরিবহন, বিপণনসহ সমগ্র চক্রে প্রায় ৮০ হাজার মানুষ জীবিকা নির্বাহ করেন।”
কক্সবাজার জেলায় মোট ৩ হাজার হেক্টর জমিতে পান চাষ হলেও একা মহেশখালীতে এর পরিমাণ ১৮০০ হেক্টর,জেলার মোট উৎপাদনের সিংহভাগ এখান থেকেই আসে।
মহেশখালী উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) ইমরান মাহমুদ ডালিম বলেন,মহেশখালীর মিষ্টি পান আমাদের একটি ঐতিহ্যবাহী কৃষিপণ্য। বাজার নিয়ন্ত্রণ, পরিবহন, প্যাকেজিং ও মান উন্নয়নে আমরা চাষিদের পরামর্শ ও সহায়তা দিচ্ছি। ভবিষ্যতে ‘মহেশখালী মিষ্টি পান’কে জিওগ্রাফিক্যাল ইন্ডিকেশন পণ্য হিসেবে নিবন্ধনের সম্ভাবনাও আমরা খতিয়ে দেখছি।”
তিনি আরও বলেন“প্রতিবছর শীত মৌসুমে যে বাণিজ্যিক কর্মকাণ্ড বাড়ে, তা স্থানীয় অর্থনীতিতে বিরাট ইতিবাচক প্রভাব ফেলে। সুশৃঙ্খল বাজার ব্যবস্থাপনায় প্রশাসন সবসময় সচেষ্ট।”
শীতকালে মহেশখালীতে পর্যটকের চাপ বাড়ে। দ্বীপ ভ্রমণ শেষে বাড়ি ফেরার সময় অনেকেই স্মারক হিসেবে সঙ্গে করেন সুগন্ধি মিষ্টি পান।বন্ধু-স্বজনের জন্য উপহার, কিংবা ফেরার পথে মুখে পুরে নেওয়া মিষ্টি খিলি,পর্যটকের কাছে মহেশখালীর পান ভ্রমণের অংশ হয়ে ওঠে।
মহেশখালীর পান কেবল একটি কৃষিপণ্য নয়,এটি একটি দীর্ঘ ঐতিহ্যের বাহক, অর্থনীতির শক্ত ভিত্তি, গ্রামীণ জীবনের পরিচায়ক এবং পর্যটন আকর্ষণ।
পাহাড়ি বাতাসের গন্ধ, সবুজ লতার শোভা, চাষির ঘামের সফলতা এবং এক খিলির মিষ্টি স্বাদ আজও মহেশখালীকে আলাদা করে দেয় দেশের সব অঞ্চল থেকে। যুগ পাল্টালেও মহেশখালীর মিষ্টি পানের ঐতিহ্য অটুট,এটাই এই দ্বীপের গর্ব, পরিচয় ও শক্তি।