প্রতিনিধি ২৫ জুলাই ২০২৫ , ৯:৫৩:৫৫ প্রিন্ট সংস্করণ

ড. মুহম্মদ মাসুম চৌধুরী: পৃথিবীতে যারা মানবাধিকারের কথা বেশি উচ্চারণ করে, তারাই মানবাধিকার লঙ্ঘন বেশি করে।যেসব উন্নত রাষ্ট্র মানবাধিকারের বাণী বেশি প্রচার করে তারাই মানবাধিকারের গলাটিপে ধরে। তাদের প্রধান ব্যবসা অস্ত্র। ব্যবসার জন্য যুদ্ধ দরকার। যুদ্ধে মানুষ হত্যা তাদের উৎসব।
যুক্তরাষ্ট্র দুনিয়াবাসীকে পৃথিবীর মানাধিকারের চবক প্রদান করে। অথচ তাদের বড় শিল্প হলো অস্ত্র নির্মাণ শিল্প। এই শিল্পের বাজার ধরতে পৃথিবীতে কোথাও না কোথাও তাদের যুদ্ধ দরকার। তাদের সমস্ত অপরাধের সহযোগী হয় বৃটিশ। তারা যে সব অপরাধে যুক্ত থাকে তার চেয়ে বড় মানবাধিকার বিরোধী কাজ কিছু হতে পারে না। মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা বলেছিলেন, লিবিয়া অভিযান তাদের ভুল দিন। একটি রাষ্ট্রকে ধ্বংস করা, প্রচুর মানব হত্যার উৎসবে মিলিত হওয়া, রাষ্ট্রনায়ক মুয়াম্মর গাদ্দাফিকে নির্মমভাবে হত্যা করা কী ভুল,না অপরাধ? ভুল ক্ষমার যোগ্য আর অপরাধ বিচারযোগ্য। মানব হত্যার উৎসব যদি ভুল হয় তাহলে অপরাধ কোনটি? ইরাক, আফগানিস্তান, পাকিস্তান, ফিলিস্তিন রাষ্ট্রে বোমা মেরে নারী-পুরুষ শিশু হত্যা করা হলো,তার প্রতিবাদ ইউরোপ আমেরিকার মানবাধিকার সংগঠন ও রাষ্ট্রগুলো করলো না, সৌদি আরবসহ যে রাষ্ট্রগুলো মার্কিন তাবেদার সে রাষ্ট্রগুলো রাজতন্ত্র রক্ষা করতে গিয়ে সকল মানবাধিকার বিরোধী কাজ করলেও ইউরোপ আমেরিকা কোন ধরনের টু শব্দ করে না।এ সব আরব রাষ্ট্রে মানবাধিকারের পক্ষে একটি বাক্য উচ্চারণ করলে মৃত্যুর মুখোমুখি হতে হয়। আরব রাষ্ট্রগুলোতে মানবাধিকার সংগঠন করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। মার্কিন ও তাদের তাবেদার রাষ্ট্রগলোনএসব দেখেও মুখ ফিরিয়ে রাখে। কোন রাষ্ট্র মার্কিন অপরাধের বিরুদ্ধে অবস্থান বা প্রতিবাদ করলে সে রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে মানবাধিকার লঙ্ঘনের আওয়াজ তুলে রাষ্ট্রটি ধ্বংসের ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়। আবার চীনের মত কোন শক্তিধর রাষ্ট্র হলে সে রাষ্ট্রে গণতন্ত্র ও মানবাধিকার না থাকলেও তারা কোন প্রতিবাদ করে না,এই হলো তাদের মানবাধিকারের নমুনা।
আমরা জানি ইরাক একটি আধুনিক রাষ্ট্র ছিল। ইরাকের নিকট রাসায়নিক অস্ত্র আছে এই অজুহাতে প্রচুর মানুষ হত্যা করা হলো, সাদ্দামকে নির্মমভাবে হত্যা করা হলো, রাষ্ট্রটি ধ্বংস করা হলো। যুদ্ধের পর আমেরিকা ইরাকে কোন ধরনের রাসায়নিক অস্ত্র খুজে ফেল না। এই ধ্বংসলীলার কোন বিচার হলো না। এটা কী যুদ্ধাপরাধ নয়? মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প নির্বাচিত হয়েই ঘোষণা করেছিলেন, ‘আল কায়েদা, আইএস,ওবামা-হিলারির সৃষ্টি। আইএস, আলকায়েদা যদি তারা সৃষ্টি করে তাহলে এসব জঙ্গি সংগঠনের হত্যাকাণ্ডের দায়ভার কাদের? ডোনাল্ড ট্রাম্প যখন প্রথম বার আমেরিকার প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থী হন তখন প্রকাশ্য ঘোষণা করেন, তিনি নির্বাচিত হলে মুসলমানদের আমেরিকা হতে বের করে দিবেন, তাদের প্রয়োজনে মঙ্গলগ্রহে পাঠিয়ে দিবেন, সব মসজিদ বন্ধ করে দিবেন, প্রয়োজনে মেক্সিকো দখল করবেন।তিনি নির্বাচিত হওয়ার পর জার্মানি চ্যান্সেলর অ্যাঙ্গেল মার্কেল ওয়াশিংটনে সফরে গেলে সাংবাদিকদের শত অনুরোধেও ট্রাম্প অসৌজন্যমূলকভাবে তার সাথে করমর্দন প্রত্যাখ্যান করেন। এসব মানবাধিকার বিরোধী কথা ও কাজের প্রতিবাদ সেখানের কোন ব্যক্তি বা সংগঠন করেনি, কারণ তাদের চামড়া সাদা, সেসব দেশে সাদা জাতি হলে মানবাধিকার বেশি পাবেন আর কালো হলে কম পাবেন।
মানবজাতির আছে একটি বিশ্ব,এই পৃথিবী নামক গ্রহে রয়েছে দশটি বিশ্ব ধ্বংস করার মত পারমাণবিক বোমা। তথাকথিত আধুনিক বিশ্ব চিকিৎসাসেবার জন্য যত অর্থ ব্যয় করে তার চেয়ে ১০ গুণ বেশি অর্থ ব্যয় করে মারণাস্ত্রের জন্য। মানব জাতিকে বাঁচানোর চেয়ে হত্যা করতে যে সব রাষ্ট্র অধিক অর্থ ব্যয় করে তাদেরকে মানবিক রাষ্ট্র বলা যায় না। তাদের হাতে মানবাধিকার কখনো নিরাপদ নয়। তাদের মুখে মানবাধিকার কথা মানে ভণ্ডামী। এই ধরনের একটি ভয়ঙ্কর বিশ্বে পৃথিবীর এক কোণে বসে মানবাধিকারের কথা বলা এবং কাজ করা খুবই কঠিন।
নিজের দেশের অস্ত্র ভাণ্ডারে বিপুল পরিমান মানববিধ্বংসী অস্ত্র মজুদ রেখে তারা অন্য দেশকে অস্ত্রমুক্ত রাখতে চেষ্টা চালায়, তারা প্রচুর শিল্পকারখানা প্রতিষ্ঠা করে পরিবেশের বড় ধরনের ক্ষতি করে পৃথিবীর পরিবেশ রক্ষায় মায়াকান্না করে, নানা ধরনের সেমিনার সম্মেলনে পরিবেশের পক্ষে ফাঁকাবুলি আওয়ায়। তারা বলতে চায়, আমরা কী করি তা দেখ না, আমরা কী বলি তা তোমরা শুন।
বিশ্বে মাদক, ইয়াবা, হিরোয়িন,যুদ্ধাস্ত্র, বোমা, পরিবেশ ধ্বংসের পিছনে কোটি কোটি ডলার ব্যয় করা হয় শুধুবঅপরাধ সংগঠিত করার জন্য। অপরাধ দমন করতে মানবাধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য সাহায্য চাইলে তেমন সাড়া পাওয়া যায় না। এ ধরনের মানসিকতা বিশ্ব মোড়লদের থাকলে পৃথিবী নামক গ্রহটি কোন দিন সুন্দর করা হবে না।
মানুষ এমন এক প্রাণী, যে গুহা হতে বের হয়ে মরুভূমিতে সর্বোচ্চ ইমারত তৈরি করেছে এবং মঙ্গলগ্রহে পাড়ি দিচ্ছে। সভ্যতার বিজ্ঞান প্রযুক্তি সবকিছু মানুষের সৃষ্টি। আমরাও মানুষ। আমরা কী মানবাধিকার প্রতিষ্ঠা করতে পারি না? তা কঠিন হলেও কিন্তু অসম্ভব নয়। শুধু দরকার আন্তরিকতা।তার জন্য মনুষ্যত্বের জাগরণ ঘটাতে হবে। তা না করে আমরা ব্যাপক ভাবে মানবাধিকার দিবস পালন করি। দিবসটি চলে গেলে আমরা মানবাধিকারের কথা ভুলতে বসি। যে ভাবে বিশ্বব্যাপী মানবাধিকার দিবস পালন করা হয় সেভাবে কাজ করলে পৃথিবী নামক গ্রহটি বহু দূর এগিয়ে যেতো। বাংলাদেশে মানবাধিকার সংগঠন কম নয়। যতগুলো মানবাধিকার সংগঠন আছে অন্য কোন বিষয়ক এত অরাজনৈতিক সংগঠন নেই। তারপরও মানবাধিকার আন্দোলন এগিয়ে গেলো না। আমাদের দেশে যারা মানবাধিকার সংগঠন করে তারা এই সংগঠন করার উপযুক্ত কিনা আগে ভাবতে হবে। আমরা কথা বলি বেশি কিন্তু কাজ করি কম। রবীন্দ্রনাথ বলেছেন, ‘আমরা উন্নয়নের পালে ফুঁ দিয়েছি, যত গাল ফুলেছে তত পাল ফুলেনি’। কবি জীবনানন্দ দাসের মা কুসুম কুমারী দেবী বলেছেন, আমাদের দেশে হবে সেই ছেলে কবে/ কথায় না বড় হয়ে কাজে বড় হবে। আমরা অনেক ভালো ভালো কথা সেমিনারে বলি, কিন্তু তার প্রভাব সমাজে কতটুকু পড়ে তা জানিনা। সাবেক পররাষ্ট্র সচিব কলামিস্ট ফারুক চৌধুরী বলেছেন, সেমিনারের কথা সেমিনারেই থাকে। এসব কথা চার দেয়ালের বাইরে যায় না। সেমিনারের কথা আলোচকগণ নিজেরাও পালন করে না, সমাজের মানুষ পালন করবে কী করে। পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ পাক ঘোষণা কারছেন, ‘লিমা তাকুলুনা মা লা তাফ আলুন’। অর্থাৎ তোমরা নিজে যা করো না তা অপরকে বল কেন?(সুরা, আস-সফ, আয়াতঃ ২) জল ছাড়া যেমন মাছ বাঁচতে পারে না তেমনি মানবাধিকার ছাড়া মানুষ বাঁচতে পারে না। অধিকারহীন মানুষ সমাজে শুকর কুকুরের মত বেঁচে থাকে। যে সব দেশে নাগরিক অধিকার ও কর্তব্য সম্পর্কে সচেতন মানুষের সংখ্যা বেশি সে দেশে গণতন্ত্রের সফলতা বেশি। নাগরিক অধিকার ও কর্তব্য সম্পর্কে সচেতনতা সৃষ্টির জন্য প্রয়োজন সুশিক্ষা। সুশিক্ষিত নাগরিকের দেশে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা সহজ হয়। মানবাধিকার প্রতিষ্ঠা করতে মানুষের চরিত্র ও দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তন করতে হবে। নেলসন ম্যান্ডেলা বলেছেন, ‘মানুষ কী ভাবে চিন্তা করে, কী নিয়ে চিন্তা করে তার পরিবর্তন করতে না পারলে মানুষের চরিত্র পরিবর্তন করা সম্ভব না’। মানুষের দৃষ্টি ভঙ্গি পরিবর্তন করতে চাইলে, যে গান বুঝে তাকে গান দিয়ে পরিবর্তন করতে হবে। যে কবিতা বুঝে তাকে কবিতা দিয়ে পরিবর্তন করতে হবে, যে সাহিত্য বুঝে তাকে সাহিত্য দিয়ে পরিবর্তন করতে হবে, যে ধর্ম বুঝে তাকে ধর্ম দিয়ে দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তন করতে হবে। সবার জন্য একই গ্রামার প্রযোজ্য নয়।
আজ বিশ্বব্যাপী চলছে মানবতা ও মানবিকতা সঙ্কট। মানবতা আর মানবিকতা এমন একটি বিষয় যা হারিয়ে গেলে বার বার বিজ্ঞপ্তি দিয়েও ফিরে পাওয়া সম্ভব নয়। মানুষ একবার দুর্নীতিতে লিপ্ত হায় গেলে যেমন ভালো পথে আর ফিরে আসতে পারে না, তেমনি মানবতা ও মানবিকতা হারিয়ে গেলে ফিরে পাওয়া সম্ভব না।
আইন করে, আইন শৃঙ্খলা বাহিনী দিয়ে এবং সংবিধান সংশোধন করে মানুষের চরিত্র সংশোধন করা যায় না। চরিত্র সংশোধন ব্যতীত মানবাধিকার প্রতিষ্ঠা করা অসম্ভব। আইন দ্বারা বাইবের জগৎ পরিবর্তন করা যায়, কিন্তু চার দেয়ালের ভিতরে ঘরে ঘরে বেড রুমে যে ধরনের হত্যাকাণ্ড ও মানবাধিকার লঙ্ঘন হয় তা তো রোধ করা সম্ভব নয়। মানুষের নিকট বর্তমান প্রয়োজন তাওয়া বা আল্লাহর ভয়।সৃষ্টিকর্তার ভয় দিয়ে দুনিয়া জয় করা যায়।
লেখক: কলাম লেখক, রাজনীতিক।