প্রতিনিধি ৯ আগস্ট ২০২৫ , ১০:২৪:৪১ প্রিন্ট সংস্করণ

চট্টবাণী: ইসলামে মানবাধিকার আল্লাহর প্রদত্ত অধিকার। এটি কারো দয়া বা অনুগ্রহ নয়। যে অধিকার মহান আল্লাহ পাক প্রদান করেছেন, সে অধিকার কেউ কেড়ে নেওয়ার অধিকার নেই। কেউ কেড়ে নিতে চাইলে তার বিরুদ্ধে, নির্যাতিতের পক্ষে দাঁড়ানো মানবাধিকারে কাজ।
মহান আল্লাহ পাক মানুষকে সৃষ্টি করেছেন ‘আশরাফুল মাখলুকাত’ বা সৃষ্টির সেরা জীব হিসেবে। এই ঘোষণার মাধ্যমে মানুষকে করা হয়েছে মর্যাদাবান।তিনি পবিত্র কোরআনে ইরশাদ করেছেন,’নিশ্চয় আমি আদম সন্তানকে মর্যাদা দান করেছি। (সুরা বনি ইসরাইল,আয়াত:৭০)
যেখানে মর্যাদাবান কোন আদম সন্তানকে অমর্যাদা করা হয় সেখানে রুথে দাঁড়ানো নৈতিক দায়িত্ব ও পবিত্র ইবাদত। এই দায়িত্বের নাম মানবাধিকার আন্দোলন। মানুষের বড় অধিকার হলো বেঁচে থাকার অধিকার। অন্যান্য অধিকার তো দূরের বিষয়, বর্তমান বেঁচে থাকার অধিকার পর্যন্ত পাওয়া কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে।পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘আমি মানুষকে সৃষ্টি করেছি সুন্দরতম অবয়বে। (সূরা: তীব, আয়াত: ৪)
মহান আল্লাহর সুন্দর সৃষ্টি হলো ”মানুষ’। সে মানুষকে জঙ্গি এবং সন্ত্রাসীরা হত্যা করে। যে ধর্মের নামে মানুষ হত্যা করে চলছে সে ধর্মের নবী হযরত মোহাম্মদুর রাসুলুল্লাহ (দ.) ঘোষণা করে গেছেন, পৃথিবীর সমস্ত মানুষ মিলে যদি অন্যায়ভাবে একটি হত্যাকাণ্ড ঘটান তাহলে কেয়ামতের দিন সবাইকে জাহান্নামের আগুনে জ্বলতে হবে। (মসনদে আহমদ)
ইসলাম মানুষের জানমাল রক্ষা করার বিধান করেছেন এবং সব ধরনের জুলুম ও রক্তপাত নিষিদ্ধ করেছেন। প্রিয় নবী (দঃ)’র বিদায় হজে ভাষণ নানা কারণে খুবই গুরুত্বপূর্ণ। জীবনের পড়ন্ত বেলায় এই ভাষণে তিনি ঘোষণা করে গেলেন, আজ এই পবিত্র দিনে, পবিত্র মাসে, পবিত্র শহরে তোমাদের জন্য যুদ্ধবিগ্রহ ও অপকর্ম হারাম করা হলো, তেমন ভাবে তোমাদের জানমাল বিনষ্ট করাও হারাম করা হলো। (বোখারী) ইসলাম ধর্ম শুধু মানুষের অধিকার নয়, শুকর কুকুরের অধিকার প্রতিষ্ঠা করেছে। আমিরুল মোমেনিন হযরত ওমর ফারুক (রা.) ঘোষণা করেছেন, আমার শাসনামলে ফোরাতের নদীর তীরের একটি কুকুরও যদি অনাহারে থাকে তাহলে আমি নিজেই তার জন্য দায়ী।
মহানবী হযরত মোহাম্মদ (দ.) ইরশাদ করেছেন, এক পাপিষ্ট ব্যক্তি তৃষ্ণার্ত হয়ে একটি কূপ হতে পানি পান করতে গিয়ে দেখতে পান একটি কুকুর পানির পিপাসায় ছটপট করছে। সে চামড়ার মোজা ভরে কূপ হতে পানি উঠিয়ে কুকুরটিকে পানি পান করান। এই কাজের বিনিময়ে আল্লাহ পাক পাপিষ্ট লোকটিকে ক্ষমা করে জান্নাত দান করেন। (বোখারী, ১/৩১৮) হযরত আবদুল্লাহ ইবনে ওমর (রা.) হতে বর্ণিত, প্রিয় নবী হযরত মোহাম্মদুর রাসুলুল্লাহ (দ.) ইরশাদ করেছেন, এক মহিলা একটি বিড়ালকে বন্দী করে রাখে। বিড়ালটি পিপাসার কারণে মৃত্যু হয়। সে অপরাধের শাস্তি ভোগ করতে মেয়েটি জাহান্নামে প্রবেশ করে। (বোখারী, ১/৩১৮) ইসলামে মানবাধিকারের সীমা ব্যাপক প্রসারিত।তার সীমা কতটুকু তা গবেষক ছাড়া আত্মস্থ করা মুশকিল। পিতা-মাতার অধিকার, বন্ধু-বান্ধবদের অধিকার, শ্রমিক মালিকের অধিকার, শাসক জনগণের অধিকারসহ সকল অধিকারের সীমা ইসলাম নির্ধারণ করে দিয়েছে।
মহান আল্লাহ পাক ‘হকু কুল্লাহ’ আল্লাহর হকের সাথে ‘হকুকুল ইবাদত’ বান্দার হক আদায় করতে কঠোর ভাবে নির্দেশ দিয়েছে। আল্লাহর হকের সাথে বান্দার হক আদায় করা ইনসানের ইনসাফ। মহান আল্লাহ পাক মানুষের হাকের ব্যাপক শুরুত্ব প্রদান করেছেন। আল্লাহর হক নষ্ট করলে আল্লাহ ক্ষমা করেন, কিন্তু বান্দার হক বা অধিকার নষ্ট করলে আল্লাহ ক্ষমা করেন না। আমরা বান্দার অধিকার আদায় করি না, অনেক ভাবে সে অধিকার নষ্ট করি। কার নিকট হতে কতটুকু অধিকার পেলেন, তা চিন্তা না করে কাকে কতটুক অধিকার দিলাম সে চিন্তা ইসলাম আগে করতে বলেছে। কেয়ামতের দিন আগে আল্লাহ পাক জানতে চাইবেন কাকে কতটুকু অধিকার প্রদান করেছে। ইসলাম ধর্ম আমাদেরকে যে দায়িত্ব দিয়েছে সে দায়িত্ব যদি আমরা যথাযথভাবে পালন করি তাহলে কোন অধিকার আদায়ের আন্দোলন আমাদের করতে হবে না। নারী পুরুষ, শ্রমিক, কর্মচারী, মালিক, সন্তান, প্রতিবেশী, শাসক, শাসিত, এতিম এমন কী বৃদ্ধ মা-বাবা এবং ভিক্ষুকের অধিকার ইসলাম প্রদান করেছে। এসব অধিকারের পক্ষে আমরা আন্দোলন করি কিন্তু নিজেরা সে অধিকার প্রদানে সক্রিয় নই। সবাই এসব অধিকার আদায় করতে চায়। কিন্তু আমরা কেউ কী চিন্তা করি, আল্লাহ প্রদত্ত নিজ নিজ দায়িত্ব পালন করি কিনা। সে দায়িত্ব পালন করলে জাতিসংঘ হতে গ্রাম পর্যন্ত কোন অধিকারের আন্দোলন আমাদের করতে হবে না। নৈতিক দায়িত্ব আমরা পালন করতে চাই না। মহামতি প্লেটোর নিকট প্রশ্ন করেছিলেন, দেশপ্রেম কী? তিনি উত্তরে বলেছিলেন, প্রতিটা মানুষ নিজের নৈতিক দায়িত্বটা সুচারুরূপে পালন করাই সর্বোচ্চ দেশ প্রেম।
ইসলাম মানুষের মানসম্মান রক্ষায় গিবত পরনিন্দা নিষেধ করেছেন। মেধা মনন বিবেক বুদ্ধি রক্ষার জন্য সব ধরনের মাদক নিষেধ করেছে। মানুষের সম্পদ রক্ষার জন্য চুরি, ডাকাতি, লুট, সুদ, ঘুষ নিষেধ করেছে। এ ধরনের শত শত আদেশ নিষেধ প্রদান করে মানুষের বহু অধিকার প্রতিষ্ঠা করে মানুষকে মর্যাদাবান করেছে।
মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে মহান আল্লাহ পাক পবিত্র কোরআনে ঘোষণা করেছেন, ‘তোমরা নিজেদের মধ্যে একে অন্যের অর্থ সম্পদ অন্যায়ভাবে গ্রাস করো না। (সুরা বাকারা, আয়াত, ১৮৮) মানুষের অধিকার রক্ষার বহু আয়াত পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ পাক নাজিল করেছেন। মানুষের মানসম্মান রক্ষায় আল্লাহ পাক পবিত্র কোরআনে ইরশাদ করেছেন, হে মুমিন গণ। কোন পুরুষ যেন অপর পুরুষকে উপহাস না করে। (সূরা হুজারাত, আয়াত: ১১) অন্যায় অবিচার হলে, মানবাধিকার দলিত মথিত হলে প্রতিবাদ প্রতিরোধ করা মুসলমানের দায়িত্ব। প্রিয় নবী হযরত মোহাম্মদুর রাসুলুল্লাহ (দ.) ইরশাদ করেছেন,তোমরা অন্যায় প্রতিরোধে এগিয়ে আসবে,প্রতিরোধের শক্তি না থাকলে মুখে প্রতিবাদ করো, তাও যদি সম্ভব না হয় তাহলে অন্যায়কে মনে মনে ঘৃণা করো। মক্কার কাফিরগণ মহানবী হযরত মোহাম্মদ (দ.) কে মানবাধিকার হতে বঞ্চিত করে। তাদের অত্যাচার অবিচারের কারণে তিনি মক্কা হতে মদিনায় হিজরত করতে বাধ্য হন। মদিনায় মুসলমানগণ সংখ্যালঘু হলেও সংখ্যাগরিষ্ঠ ইহুদী, খৃস্টান, পৌত্তলিকরা সম্মিলিত ভাবে মহানবী (দ.)কে রাষ্ট্র নায়ক নির্বাচিত করেন।
কারণ তিনি মদিনায় সর্বধর্মের মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। যে মক্কাবাসী চরম মানবাধিকার লঙ্ঘন করেছিল,সে মক্কা বিজয়ের পর তাদের প্রতি নবীজি যে ধরনের আচরণ করেন,তা দুনিয়াবাসীর জন্য এক মহান শিক্ষা। মক্কা বিজয়ের পর সকলের নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠা করেন। সবাইকে ক্ষমা করেন। কাফির সর্দার আবু সুফিয়ানকে ক্ষমা করেন এবং নিরাপত্তা দেন। প্রচুর মুসলমান হত্যাকারী হিসেবে আবু সুফিয়ান হতে প্রতিশোধ না নিয়ে একটি বাক্য উচ্চারণ (লাইলাহা ইল্লালাহ…) করার সাথে সাথে সাহাবায়ে রাসুল হয়ে যান। এই ধরনের ক্ষমা দুনিয়াবাসীর জন্য বিরল বিষয়। মহানবী হযরত মোহাম্মদ (দ.) ইরশাদ করেছেন, তোমরা দুনিয়াবাসীর প্রতি দয়া করো, আকাশবাসী (আল্লাহ) তোমাদের প্রতি দয়া করবেন। (তিরমিজী) ধর্ম নিয়ে মানুষ বাড়াবাড়ি করে। সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা সংঘাত করে। ধর্মের নামে মানুষ হত্যা করে মানুষের বেঁচে থাকার অধিকার নষ্ট করে। প্রিয় নবী (দ.) বিদায় বেলায়, বিদায় হজের ভাষণে ঘোষণা করে গেছেন, ধর্ম নিয়ে বাড়াবাড়ি করি না, অতীতে বহু জাতি ধর্ম নিয়ে বাড়াবাড়ি করে ধ্বংস হয়ে গেছে। এধরনের বহু অধিকারের কথা তিনি উচ্চারণে, আচরণে প্রয়োগ করে গেছেন।
লেখক: কলাম লেখক, রাজনীতিক।