তথ্যপ্রযুক্তি

ফেসবুক ভিডিও থেকে আয় বন্ধ নিয়ে বিভ্রান্ত : ফুয়াদ মোহাম্মদ সবুজ

  প্রতিনিধি ২৬ জুন ২০২৫ , ১০:৩৯:২৫ প্রিন্ট সংস্করণ

চট্টবাণী: গত দুয়েকদিন ধরে দেশের বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে দাবি করা হচ্ছে, ফেসবুক ভিডিও থেকে আয় বন্ধ করে দিয়েছে। এই সংবাদটি প্রযুক্তিগত বাস্তবতা ও ফেসবুকের নতুন কনটেন্ট কাঠামোর সঙ্গে সম্পূর্ণ সাংঘর্ষিক। একজন প্রযুক্তি বিশ্লেষক হিসেবে স্পষ্ট করে বলা যায়- ফেসবুক এমন কোনো সিদ্ধান্ত নেয়নি যা ভিডিও নির্মাতাদের আয় বন্ধ করতে পারে। বরং কোম্পানিটি ব্যবহারকারীদের অভিজ্ঞতা উন্নয়নের লক্ষ্যে ভিডিও ও রিলসকে একটি ইউনিফায়েড প্ল্যাটফর্মে রূপান্তর করেছে, যার ফলে ভিজ্যুয়াল কনটেন্ট এক্সপ্লোরেশন আরও সহজ ও গতিশীল হয়েছে।

মূলত, ফেসবুক এখন শর্টফর্ম (রিলস) ও লংফর্ম (ভিডিও) কনটেন্টকে একত্রে রেন্ডার করছে, একটি অভিন্ন ‘ভিডিও’ ট্যাবের মাধ্যমে। এটি মেটার কনটেন্ট কনজাম্পশন মডেল পুনর্গঠনের অংশ। ভিডিওর ধরন পরিবর্তিত হলেও মনিটাইজেশন মডিউল অপরিবর্তিত রয়েছে। ইনস্ট্রিম অ্যাড, ফ্যান সাবস্ক্রিপশন, ব্র্যান্ডেড কনটেন্টসহ সব ফিচার আগের মতোই কার্যকর। অনেকেই ভিডিও ফিডের পরিবর্তনকে ভুলভাবে “মনিটাইজেশন বন্ধ” বলে ব্যাখ্যা করছেন, অথচ এটি মূলত UI/UX স্তরে একটি ইন্টিগ্রেশন মাত্র। প্রযুক্তিগতভাবে এটি বিকেন্দ্রীকরণ নয়, বরং কেন্দ্রীভূত উন্নয়ন।

এনগেজমেন্ট-ভিত্তিক আয়ের মডেল ফেসবুকের অ্যাড ডেলিভারি সিস্টেমের কেন্দ্রবিন্দু। একজন ব্যবহারকারী যখন কোনো ভিডিওতে কমেন্ট করেন, লাইক দেন বা শেয়ার করেন, তখন সেই কনটেন্টের অ্যালগরিদমিক প্রাধান্য বাড়ে। ফলে ইনস্ট্রিম অ্যাড প্রদর্শনের হার বাড়ে এবং বিজ্ঞাপনদাতা ফিডে মূল্য পরিশোধ করে। নির্মাতারা এভাবেই রেভিনিউ পান। এছাড়া ভিডিওতে থাকা ওয়েবসাইট বা ল্যান্ডিং লিংকে ক্লিক করলে ওয়েব পেজের অ্যাড নেটওয়ার্ক থেকেও ইনকাম আসে। ফেসবুক মনিটাইজেশন হলো একটি মাল্টি-চ্যানেল অ্যাডভারটাইজিং ফ্রেমওয়ার্ক, যা এখনো পূর্ণদমে সচল।

এই বিভ্রান্তির মূল কারণ তথ্যভিত্তিক সাংবাদিকতার ঘাটতি এবং ক্লিকবেইট সংস্কৃতির অন্ধ অনুসরণ। অনেক সংবাদমাধ্যম মেটার অফিসিয়াল নিউজরুম, হেল্পসেন্টার, বা Meta for Creators ড্যাশবোর্ডের ঘোষণাগুলো না পড়েই ইউটিউব, টিকটক বা অন্যান্য ব্লগারদের অপূর্ণ ব্যাখ্যা নিয়ে প্রতিবেদন তৈরি করে। প্রযুক্তিনির্ভর পরিবর্তনকে সহজেই ‘আয় বন্ধ’ বলার প্রবণতা সাধারণ পাঠকদের ভয় পাইয়ে দেয়। অথচ ফেসবুক কখনো কোনো ফিচার রিমুভ করলে তা পূর্বঘোষণা, ড্যাশবোর্ড ব্যানার এবং অফিশিয়াল ব্লগের মাধ্যমে স্বচ্ছভাবে জানায়।

কনটেন্ট নির্মাতাদের উচিত ইনসাইটস ও অ্যাড ম্যানেজার পর্যবেক্ষণ করে আয়ের রুটগুলো বিশ্লেষণ করা। নির্মাতা ড্যাশবোর্ডে গিয়ে স্পষ্ট দেখা যায়—ভিডিও ভিউ, সিপিএম, সিটিআর, আনুমানিক উপার্জনসহ সব তথ্য আগের মতোই উপস্থিত। ফিচার ইন্টিগ্রেশন ইউআই ও অ্যালগরিদমে সামান্য হেরফের আনতে পারে, কিন্তু অর্থনৈতিক কাঠামো অপরিবর্তিত থাকে। এ কারণে প্রযুক্তি বোঝা ছাড়া যেকোনো ফিচার আপডেটকে নেতিবাচক রূপে ব্যাখ্যা করা, কেবল ভুল নয়, দায়িত্বজ্ঞানহীনও। আর এ দায় কেবল সংবাদমাধ্যমের নয়, কনটেন্ট নির্মাতারও সচেতন হওয়া জরুরি।

সার্বিকভাবে যদি বলি তাহলে, ফেসবুক ভিডিও থেকে আয় বন্ধ হয়নি- এটা শুধুই এক ধরনের মিথ্যাচার বা ভুল ব্যাখ্যা। বরং ফেসবুক কনটেন্ট পরিবেশ ও এনগেজমেন্ট অপটিমাইজ করতে প্রতিনিয়ত ইন্টিগ্রেটেড স্ট্র্যাটেজি নিচ্ছে। একীভূত ভিডিও প্ল্যাটফর্মের ফলে ব্যবহারকারীর অভিজ্ঞতা উন্নত হবে এবং নির্মাতাদের পক্ষে কনটেন্ট বন্টন ও রিচ বাড়ানো আরও সহজ হবে। একজন প্রযুক্তি বিশ্লেষকের দৃষ্টিকোণ থেকে এটি স্পষ্ট, এই পরিবর্তন হলো উন্নয়ন, ধ্বংস নয়। তথ্যভিত্তিক বিশ্লেষণই পারে গুজবকে রুখে দিতে এবং ডিজিটাল ইকোসিস্টেমে স্বচ্ছতা বজায় রাখতে।

ফুয়াদ মোহাম্মদ সবুজ
সাংবাদিক ও প্রযুক্তি বিশ্লেষক
শিক্ষার্থী: ইউনিভার্সিটি অব ইনফরমেশন অ্যান্ড টেকনোলজি সায়েন্স।

আরও খবর 18

Sponsered content