প্রতিনিধি ২০ ফেব্রুয়ারি ২০২৫ , ১২:০৮:১৮ প্রিন্ট সংস্করণ

নুরুল আবছার নূরী: পৃথিবীতে এমন কিছু মানুষ আছেন, যাঁদের মেধা, মনন ও প্রজ্ঞা একান্ত বিধাতা প্রদত্ত। যিনি নিজ প্রতিভায় এ দেশের মানুষের হৃদয়ে ঠাঁই নিয়েছেন স্বমহিমায়, এক স্বতন্ত্র প্রতিষ্ঠান হিসেবে। তিনি হচ্ছেন দেশের খ্যাতিমান সংগীত গুরু ওস্তাদ নীরদ বরণ বড়ুয়া।
সরকার বিভিন্ন ক্ষেত্রে অবদানে দেশের ১৪ বিশিষ্ট জনকে ২০২৫ সালে একুশে পদকের জন্য মনোনীত করেছেন। গত ৬ ফেব্রুয়ারী সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় এই সিদ্ধান্তের কথা জানায়। সে তালিকায় চট্টগ্রামের ফটিকছড়ির কৃতিসন্তান সংগীত গুরু ওস্তাদ নীরদ বরণ বড়ুয়ার নামও রয়েছে। শুক্রবার ঢাকায় প্রধান উপদেষ্ঠা নিজে একুশে পদক হাতে তুলে দেওয়ার কথা রয়েছে।
কিছু কথা- দেশের বিভিন্ন পরিমণ্ডলে অনেক জ্ঞানী মানুষের জন্ম হয়েছে। যাঁদের মেধা-মনন-প্রজ্ঞা, শ্রম, আত্মত্যাগে সমাজ সদ্ধর্ম আলোকিত হয়েছে, বিকশিত হয়েছে, সমৃদ্ধ হয়েছে। এ সমস্ত গুণীর স্মরণ করা বা নতুন প্রজন্মদের কাছে তাঁদের কীর্তির কথা তুলে ধরা সবার দায়িত্ব। এসব গুণী ব্যক্তিরা যাতে বিস্মৃতির অতল গহবরে হারিয়ে না যায়, বিষয়টি ভাবা দরকার।
সংক্ষিপ্ত জীবনী, উপমহাদেশের শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের উজ্জ্বল নক্ষত্র ওস্তাদ নীরদ বরণ বড়ুয়া’র জন্ম ফটিকছড়ির আবদুল্লাপুর গ্রামে ১৯৩৬ সালে। পিতা নিকুঞ্জ বিহারী বড়ুয়া ও মাতা বিরলা বালা বড়ুয়ার একমাত্র পুত্র সন্তান তিনি। আজীবন সত্যিকার অর্থে সঙ্গীতপ্রাণ এ মানুষটি ১৪ বছর বয়সে বাবা হারা হন এবং ১৫ বছর বয়সে সঙ্গীত শিক্ষার উদ্দেশ্যে ভারতের কলকাতা যান। সেখানে তাঁর প্রথম হাতেখড়ি হয় ওস্তাদ নাটু ঘোষের কাছে। তিন বছর যাবত নাটু ঘোষের কাছে সঙ্গীত শিক্ষা লাভের পর তিনি বিশিষ্ট ধ্রুপদী গায়ক অনিল ঘোষের কাছে পাঁচ বছর ধ্রুপদী শিক্ষা নেন। এরপর ভর্তি হন অল-ইন্ডিয়া মিউজিক কলেজে। সেখানে সঙ্গীতাচার্য্য প্রফুল্ল কুমার সেনের অধীনে সাত বছর শাস্ত্রীয় সঙ্গীতে জ্ঞান লাভ এবং স্নাতক প্রাপ্ত হন। পরে ১৯৬৫ সালে তিনি স্বদেশে ফিরেন।
তাঁর বিকশিত সঙ্গীত প্রতিভায় আকৃষ্ট হন চট্টগ্রাম পোর্ট ট্রাস্টের তৎকালীন সিনিয়র মেডিকেল অফিসার কামাল এ খান। তিনি নীরদ বরণ বড়ুয়াকে গভীর আগ্রহ ভরে নিজ ঘরে রাখেন এবং চট্টগ্রামের সুধী সমাজে তাঁকে পরিচয় করিয়ে দেন। ক্রমে তিনি চট্টগ্রাম বেতার কর্তৃপক্ষের সাথে পরিচিত হন এবং তাঁদের অনুরোধে তিনি চট্টগ্রাম বেতারে যোগদেন।
পাক-ভারত উপমহাদেশের সুপ্রাচীন সঙ্গীত কেন্দ্র, চট্টগ্রাম আর্য্য সঙ্গীত সমিতি তাঁকে বরণ করেন এবং সমিতি পরিচালিত ‘সুরেন্দ্র সঙ্গীত বিদ্যাপীঠের একজন সঙ্গীত শিক্ষক হিসেবে বরণ করেন। ওস্তাদ নীরদ বরণ বড়ুয়া আর্য্য সংগীত খ্যাত সুরেন্দ্র সংগীত বিদ্যাপীঠে দীর্ঘ ২৫ বছর অধ্যক্ষ পদে অধিষ্ঠিত থেকে চট্টগ্রামে শাস্ত্রীয় সঙ্গীত ক্ষেত্রে নবযুগের সূচনা করেন এবং দেশে অসংখ্য গুণী শিক্ষার্থী সৃষ্টি করেন। যারা এখন দেশ-বিদেশে সুনামে সংগীত সাধনায় রত আছেন। ১৯৮৮ সালে তিনি আর্য সংগীত থেকে অবসর নেন। পরে বৃদ্ধ বয়সে শিক্ষার্থীদের অনুরোধে চট্টগ্রাম বৌদ্ধ বিহারের নিকটস্থ মোমিন রোডস্থ তাঁর বাসভবনে আবার শিক্ষাদান শুরু করেন। যা বর্তমানে “সুর সপ্তক সঙ্গীত বিদ্যাপীঠ” নামে পরিচিত।
দেশে সম্ভবতঃ এখন পর্যন্ত সঙ্গীত বিষয়কে ভিত্তি করে একমাত্র নাটক ‘সুরের সন্ধান’র রচয়িতা নীরদ বরণ বড়ুয়া। নাটকটি পর পর দু’বার মঞ্চস্থ হয় এবং ব্যাপক প্রশংসা অর্জন করে। ওস্তাদ নীরদ বরণ বড়ুয়া রচিত সংগীত বিষয়ক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, প্রয়োজনীয় গ্রন্থ; আরোহ-আবরোহ সংগীত পিপাসু, অনুরাগী ও সংগীত শিক্ষার্থীদের কাছে আলোর দিশারী হয়ে পথ দেখাচ্ছে।
২০০১ সালের ৯ আগস্ট সবাইকে শোকের সাগরে ভাসিয়ে ওস্তাদ নীরদ বরণ বড়ুয়া পরপারে পাড়ি জমান। কিন্তু কেউ কি জানত গ্রামের সেই ছেলে একদিন দেশের এত বড় উপাধি পেয়ে খ্যাতি অর্জন করবে? মানুষের সহজ-সরল জীবনযাত্রা, আর চাওয়া-পাওয়ার ক্ষেত্র এভাবে তুলে আনবেন তাঁর সংগীতে?
পরিশেষে কৃতীমান এই গুণীর নামে উপজেলায় একটি সড়ক কিংবা প্রতিষ্ঠান করে তাঁকে যথাযথ সম্মান এবং তাঁর স্মৃতিকে ধরে রাখার উদ্যোগ গ্রহণ জরুরি। অন্যথায় অবহেলায় একদিন তিনি হারাবেন। তিনি চলে গেলেও তাঁর অনবদ্য সৃষ্টি দিয়ে আমাদের মাঝে বেঁচে থাকবেন চিরকাল। তাঁর অবদানের স্বীকৃতি স্বরূপ এই নন্দিত গুরুকে মরণোত্তর রাষ্ট্রীয় সম্মানে ভূষিত করায় আমরা কৃতজ্ঞ। ওস্তাদজীর প্রতি আমাদের গভীর শ্রদ্ধা।