সাহিত্য

সাম্রাজ্যবাদী মানবাধিকার: নিজের বেলায় আইনজীবী পরের বেলায় বিচারক: ড. মুহম্মদ মাসুম চৌধুরী

  প্রতিনিধি ১৬ জুলাই ২০২৫ , ৯:৫৭:১০ প্রিন্ট সংস্করণ

চট্টবাণী: মানবাধিকার মানুষের জন্মগত অধিকার। এটি কারো করুণা বা দয়া নয়। পৃথিবীতে মানবাধিকার প্রতিষ্ঠায় বড় বাধা হলো যারা এই গ্রহে মানবাধিকার প্রতিষ্ঠার গলাবাজিতে চ্যাম্পিয়ন তারাই বেশি মানবাধিকার লঙ্ঘন করে।

ডিসেম্বর মাস, বিশ্ব মানবাধিকার দিবসের মাস। এই মাস বাঙালির হাজার বছরের সেরা বিজয়ের মাস। এই সেরা অর্জন শতাব্দির সেরা নিষ্ঠুর গণহত্যা ও চরম মানবাধিকার লঙ্ঘনের মাধ্যমে অর্জিত হয়। মুক্তিযুদ্ধ ছিল শতাব্দীর জঘন্যতম ১৪টি গণহত্যার একটি। এই মানবতা বিরোধী অপরাধে সাম্রাজ্যবাদী মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সমর্থন ছিল। সাম্রাজ্যবাদী চরিত্র হলো কোন জাতিকে ধ্বংস করতে হলে, সে জাতির মেধা ও সংস্কৃতিকে ধ্বংস করে দাও।

এই বাংলাদেশের জনপদ পিছঢালা রাজপথে রক্ত ঢালার রাজপথ। দুনিয়ার বুকে কোন জাতিকে মাতৃভাষার জন্য রক্ত দিতে না হলেও বাঙালি জাতিকে বাংলা ভাষার জন্য বাংলাদেশ ও আসামে রক্ত দিতে হলো। বাঙালি জাতি সংখ্যাগরিষ্ঠ হলেও আমরা বাংলা ভাষাকে একমাত্র পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা করার দাবি করিনি। উর্দু, ইংরেজির পাশাপাশি বাংলাকে পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষার দাবি করেছি। ভারতে ২১টি রাষ্ট্রীয় আছে। তদ্রুপ একটি অন্যতম রাষ্ট্রীয় ভাষার দাবি আদায়ে রক্তে রঞ্জিত হলো রাজপথ। পাকিস্তানিরা আমাদের ভাষার অধিকার খর্ব করলো। বাঙালির একটি হাজার বছরের পুরনো শক্তিশালী সংস্কৃতি আছে। আমরা যখন বাঙালির কালচারের অধিকারের কথা বললাম, তখন তারা আমাদের উপহাস করে বললেন, বাঙালিদের আবার কিসের কালচার, বাঙালিদের জন্য আছে শুধু এগ্রিকালচার। বাঙালি সাহিত্য-সংস্কৃতি পশ্চিম পাকিস্তানি সাহিত্য সংস্কৃতি হতে শক্তিমান ছিল। পাকিস্তান শাসকগোষ্ঠী বলেছিল, রবীন্দ্রনাথ হিন্দু কবি তাকে বাদ দিতে হবে। অথচ রবীন্দ্রনাথ ছিলেন ব্রহ্মধর্মের অনুসারী। যারা নিরাকার ঈশ্বরবাদে বিশ্বাসী। পাকিস্তানিরা নজরুলকে সংশোধন করতে বললেন। কারণ কবি নজরুল কালি ও শ্যামা সঙ্গীত রচনা করেছেন। এসব হিন্দু সঙ্গীত বাদ দিতে হবে ইত্যাদি দাবি তুলে। বাঙালিরা রবীন্দ্র-নজরুল ধর্ম শিখার জন্য কখনো চর্চা করেনি। ধর্ম শিখার জন্য কোরআন হাদিস ফিকাহ ইত্যাদি যথেষ্ট রয়েছে। রবীন্দ্র-নজরুল চর্চা করা হয় ভাষা সাহিত্য সংস্কৃতি শিখার জন্য। যে রূপ আরবের আইয়ামে জাহেলিয়াতের অশ্লীল কবি ইমরুল কায়েসের ‘সাবা মুয়াআল্লাকা’ কাব্য গ্রন্থটি ভাষা সাহিত্য শিখার জন্য এখনো সকল মাদ্রাসায় পাঠ করা হয়। পাকিস্তানি শাসকগণ তখন বলেছিলেন, বাংলা ভাষা হিন্দুর ভাষা। এই ভাষা চর্চা করতে চাইলে এই ভাষাকে মুসলমানিকরণ করতে হবে। ভাষাকে খতনা করতে হবে। বাংলা ভাষায় হিন্দুয়ানী শব্দ বাদ দিয়ে মুসলমানী শব্দ প্রয়োগ করতে হবে। নমুনা স্বরূপ বললো, কবি কাজী নজরুল ইসলাম তাঁর কবিতায় বলেছেন,’আমরা রচিব মহাশ্মশান’। শ্মশান’ শব্দটি বাদ দিয়ে ‘গোরস্থান’ লেখতে হবে। বলতে হবে ‘আমরা রচিব গোরস্থান’। আমাদের শিশুরা কবিতা পড়তো, ‘সকালে উঠিয়া আমি মনে মনে বলি / সারাদিন আমি যেন ভালো হয়ে চলি।/ তারা সংশোধন করে বলেন, কবিতার পংক্তি এইভাবে পড়লে হবে না। পড়তে হবে, ‘ফজরে উঠিয়া আমি দিলে দিলে বলি/ সারা দিন আমি যেন নেক হয়ে চলি’। তারা এভাবে আমাদের ভাষা সাহিত্য সংস্কৃতির অধিকার খর্ব করে।

পাকিস্তানীরা নানা ভাবে আমাদের ইতিহাস বিকৃত করে।হাজার বছরের ‘বাংলা’ নামটি পরিবর্তন করে ‘পূর্ব পাকিস্তান’ নামকরণ করে। বঙ্গবন্ধুর একটি বক্তব্যে বলেছেন, পাকিস্তানিরা নানাভাবে আমাদের ইতিহাস বিকৃতি করে। হাজার বছরের বাংলাটি ‘বঙ্গোপসাগরের পাশে ছাড়া বাংলা নামটি কোথাও রাখা হলো না। বাংলা নামটি শুধু জলে ছিল, স্থলে নয়। তারা পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের মধ্যে বৈষম্য সৃষ্টি কারে আমাদের অর্থনৈতিক শোষণ করলো। রাজনৈতিকভাবে গোলাম বানালো, বারবার গণতান্ত্রিক অধিকার ধ্বংস করলো, ১৯৭০ সালের জাতীয় নির্বাচনের নির্বাচিত প্রতিনিধির হাতে ক্ষমতা স্থানান্তর না করে মুক্তিযুদ্ধের দিকে ঠেলে দিল। এই যুদ্ধে ৩০ লক্ষ মানুষ হত্যা এবং ২ লক্ষ মা-বোনের সম্ভ্রমহানি করলো। এ ধরনের বহু মানবাধিকার বিরোধী কাজে বাঙালির বিরুদ্ধে মার্কিনিরা পাকিস্তানিদের সমর্থন সহযোগিতা করে গেল নির্লজ্জভাবে। তখন পাকিস্তানিরা বাঙালিদের মুসলমান মনে করতো না, হিন্দু মনে করতো। অথচ তৎকালে পশ্চিম পাকিস্তান হতে পূর্ব পাকিস্তানের মুসলমানের সংখ্যা ছিল অধিক। সংখ্যালঘিষ্ট মুসলমানের ফতোয়ায় সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমানগণ হিন্দু ধর্মের অনুসারী বলে প্রচার করা হলো। অথচ তখন ছিল বাংলাদেশ দ্বিতীয় বৃহৎ মুসলিম রাষ্ট্র। তারপরও আমাদের ধর্মীয় অধিকার ছিল না।

স্বাধীনতার পর বঙ্গবন্ধু ও তাঁর পরিবার এবং আত্মীয় স্বজনের বহুলোক হত্যা করলো। শিশু রাসেল, অন্তঃসত্ত্বা আরজু মনিকে হত্যা করলো, জেলখানা যুদ্ধের সময় নিরাপদ রাখা আন্তর্জাতিক আইন হলেও জেলখানায় চার জাতীয় নেতাকে নির্মমভাবে হত্যা করা হলো, এসব হত্যাকাণ্ডের কোন বিচার হবে না বলে ‘ইনডেমনিটি আইন পাশ করলো, আইনের হাত হতে বাঁচার আইন করা দুনিয়াতে একটি বিরল ঘটনা। বহু রাষ্ট্রে অনেক রাষ্ট্র প্রধান ও সরকার প্রধান হত্যা হয়। কিন্তু কেউ আইন করে হত্যাকাণ্ডে বৈধতা দেয়নি। হত্যাকারীদের বিদেশে বাংলাদেশ দূতাবাসে চাকরি প্রদান করে পুরস্কার প্রদান করা হলো। এত গুলো জঘন্য অপরাধে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র জড়িত থাকা বা সমর্থন দেওয়া কোন ধরনের মানবাধিকার? ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় এসে বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচার শুরু করে, ২০০১ সালে বিএনপি ক্ষমতায় এসে সে বিচারের শুনানি স্থগিত করলে মার্কিন শক্তি কোন প্রতিবাদ করলো না, ২১ আগস্ট হত্যাকাণ্ডের কোন জোরালো প্রতিবাদ করলো না, কিন্তু ৩০ লক্ষ মানুষ হত্যার অপরাধে যুদ্ধাপরাধীর বিচার করে ফাঁসি না দিতে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও জাতি সংঘের মহাসচিব প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নিকট ফোন করতে লজ্জা হলো না। ১০ টাকা চুরি করলে বিচার হয়, ১০০ টাকা চুরি করলে বিচার হয়, আর ৩০ লক্ষ মানুষ হত্যার বিচার হবে না, এ কেমন মানবাধিকার। বাংলাদেশ যখন ১১ লক্ষ রোহিঙ্গা শরণার্থী আশ্রয় প্রদান করে তখন বিশ্ব মোড়লদের স্বীকৃতি মিলে না, পার্বত্য শান্তিচুক্তি ও জঙ্গিবাদ দমনের মত বড় বড় মানবাধিকারের কাজ করলেও তারা এসবের স্বীকৃতি দিতে কৃপণ।

দুনিয়ার বুকে দেশে দেশে যতগুলো সামরিক অভ্যুত্থান ঘটেছে, এসব ক্যু-এর মধ্যে দৃশ্য-অদৃশ্য ৯০ ভাগ ভূমিকা রেখেছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। সামরিক সরকার ক্ষমতায় বসে সংবিধান স্থগিত করে, জরুরি অবস্থা জারি করলে বাক স্বাধীনতা-সংবাদপত্রের স্বাধীনতা থাকে না, মানবাধিকার দলিত হয়। এসব অপরাধের পরও সামরিক সরকার ঠিকে থাকে মার্কিন সহযোগিতায়। আবার তাদের স্বার্থের বাইরে গেলে অনেক রাষ্ট্র ও সরকার প্রধানকে হত্যা করে। বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড কোন ধরনের মানবাধিকার? তারা অন্য দেশে যেভাবে উগ্র আগ্রাসী ভূমিকা গ্রহণ করে তা দেখে মনে হয় তারা এসব রাষ্ট্রগুলোকে মার্কিন অঙ্গরাজ্য মনে করে।

তারা তেল সমৃদ্ধ আরব রাষ্ট্রগুলো নিয়ন্ত্রণ করে তেল সম্পদ লুট করতে অবৈধ ইসরায়েল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করে। এই ইসরায়েল ইহুদী কর্তৃক নিরীহ ফিলিস্তিনি মুসলমানদের যখন হত্যা ও নির্যাতন করে তখন সাম্রাজ্যবাদী মানবাধিকারের কন্ঠস্বর কোথায় থাকে?

যে আমেরিকা আমাদেরকে গণতন্ত্র ও মানবাধিকার শিখায় সে আমেরিকায় বাংলাদেশ হতে বেশি অপরাধ সংগঠিত হয়। বাংলাদেশের কারাগারগুলোতে দণ্ডপ্রাপ্ত ও বিচারাধীন বন্দীর সংখ্যা ৮০ হতে ৮২ হাজার। আর যুক্তরাষ্ট্রের জনসংখ্যা আমাদের দ্বিগুণ অথচ বন্দীর সংখ্যা প্রায় ২০ লক্ষ। বছরে খুন হয় ২০ হাজার মানুষ অথচ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সংখ্যা আমাদের চেয়ে অনেক বেশি। প্রশিক্ষণ ও অস্ত্র তাদের অনেক আধুনিক। তারা আমাদের মানবাধিকারের সবক দেন।

বাংলাদেশের বিচার বহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের জন্য যুক্তরাষ্ট্র র‍্যাবকে সাময়িক নিষেধাজ্ঞা দেয়। যুক্তরাষ্ট্র ভার্চুয়াল গণতন্ত্র সম্মেলনে বাংলাদেশকে আমন্ত্রণ জানালো না। অথচ কয়েক মাস পরই যুক্তরাষ্ট্রের অঙ্গরাজ্য কেমব্রিজে পুলিশের গুলিতে বাংলাদেশি ছাত্র সাইদ ফয়সল নিহত হয়। ওয়াশিংটন পোস্ট পত্রিকার তথ্য অনুযায়ী যুক্তরাষ্ট্রে প্রতিবছর পুলিশের হাতে নিহত হয় গড়ে এক হাজার মানুষ। যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বের ১০ বিচার বহির্ভূত হত্যাকাণ্ডে একটি দেশ। জনসংখ্যার অনুপাতে আমাদের দেশে ৫০০ মানুষ বিচার বহির্ভূত হত্যা হওয়ার কথা, কিন্তু কত জন হত্যা হয় বাংলাদেশে? অথচ তারা ভাবে আমাদের চেয়ে তারা সভ্য।
লেখক: কলাম লেখক, রাজনীতিক

আরও খবর 23

Sponsered content