Warning: Undefined variable $query in /home/jagosong/chattabani.com/wp-content/themes/j-news/single.php on line 70

Warning: Attempt to read property "post" on null in /home/jagosong/chattabani.com/wp-content/themes/j-news/single.php on line 70

Warning: Attempt to read property "ID" on null in /home/jagosong/chattabani.com/wp-content/themes/j-news/single.php on line 70

Warning: Undefined property: WP_Error::$cat_ID in /home/jagosong/chattabani.com/wp-content/themes/j-news/single.php on line 92
সাহিত্য

এ পি জে আবদুল কালামের স্বপ্নের অসাধারণ কথামালা : ড. মুহম্মদ মাসুম চৌধুরী

  প্রতিনিধি ৩১ অক্টোবর ২০২৫ , ৯:১৮:১২ প্রিন্ট সংস্করণ

চট্টবাণী: ভারতের সাবেক রাষ্ট্রপতি এ পি জে আবদুল কালাম একজন স্বপ্নের ফেরীওয়ালা। ভালোবাসতেন নিজকে শিক্ষক হিসেবে পরিচয় দিতে। দক্ষিণ ভারতের মাদ্রাজে রামনাথ স্বামী জেলার রামেশ্বরমে ছিল তাঁর বসবাস। বাবা ছিল নৌকার মাঝি। তিনি বাবাকে দেখতেন নৌকা নিয়ে এ দ্বীপ থেকে অন্য দীপে প্রতিদিন যাত্রী পারাপার করতে। এ পেশার আয়ে তাদের জীবন চলতো না বলে রেলস্টেশন থেকে খবরের কাগজের যে সব বান্ডিল চলন্ত ট্রেন থেকে ফেলে দেয়া হতো সেগুলো কুড়িয়ে শহরে পৌঁছে দেয়ার কাজ করেছেন বহুদিন। এ কাজে তেমন অর্থ উপাজন না হওয়ায় তিনি ভাবলেন,বাবা যে নৌকা চালান তাতে যদি একটি যন্ত্র সংযোজন করে দেওয়া যায় তবে উপার্জন বৃদ্ধি হবে। এই যন্ত্র সংযোজন করতে গিয়ে গতিবৃদ্ধির স্বপ্ন পেয়ে বসে।

সে স্বপ্নের অনুশীলনের মাধ্যমে বিমান প্রযুক্তির ভাবনা পেয়ে বসে। গতিবৃদ্ধি করতে গিয়ে একদিন হয়ে উঠেন মিসাইলম্যান। নৌকা তৈরীর মিস্ত্রীরা নৌকাই তৈরী করে সারা জীবন। কিন্তু ব্যতিক্রম হয় আবদুল কালাম। কারণ আবদুল কালাম স্বপ্ন দেখেন এগিয়ে যাওয়ার। মাঝির ছেলে মাঝি হতে চাননি, স্বপ্ন দেখলেন বিজ্ঞানী হবেন। শুধু বড় বিজ্ঞানীই হলেন না, রাষ্ট্রপতিও হয়েছিলেন। কারণ তিনি দেখেছিলেন বড় হওয়ার স্বপ্ন। তিনি বিশ্ববাসীকে জানালেন, ‘আমরা যা ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে দেখি তা স্বপ্ন নয়, যে স্বপ্ন ঘুমাতে দেয় না তাই স্বপ্ন।’

মানুষ কত বড়? প্রতিটি মানুষ তার স্বপ্নের চেয়ে অনেক বড়। ভারতের সাবেক রাষ্ট্রপতি ১৮ অক্টোবর ২০১৪ সালে ঢাকার বুকে দাঁড়িয়ে ঘোষণা করলেন, ‘বড় স্বপ্ন দেখ, ছোট স্বপ্ন দেখা অপরাধ’। বড় স্বপ্ন মানুষকে বড় করে।স্কুল জীবনে বারাক ওবামার শিক্ষক জানতে চেয়েছিলেন, বড় হলে কী হতে চাও? তিনি বলেছিলেন, আমেরিকার প্রেসিডেন্ট। এ কথা শুনে সবাই হেসেছিলেন। কী ভাবে সম্ভব ! একজন বিদেশি, বিধর্মী, কৃষ্ণাঙ্গ সাদা ঘরে (হোয়াইট হাউস) প্রবেশ করবে! তিনি তাঁর বড় স্বপ্ন পুরণের জিদ ধরেন।প্রমাণ করলেন, চেষ্টা করলে আমেরিকার প্রেসিডেন্টও হওয়া যায়।

আবদুল কালাম বলেছেন, ‘স্বপ্নের একটি বাধা আছে, শত্রু আছে। সে শত্রুকে চিনতে পারলে পরাজিত করতে পারবে। তার পরাজয় মানে জীবনের জয়। সে শত্রুটি হলো ‘হতাশা’। স্বপ্ন মানে আশা তার বিপরীত হতাশা’।

আমরা জানি আশা আর ভালোবাসা চলেগেলে মানুষ বেঁচে থাকতে পারে না। আত্মহত্যা করে। বেঁচে থেকেও অনেক মানুষ মৃত। যাদের স্বপ্নের মৃত্যু হয়েছে তারা মৃত।স্বপ্নের মৃত্যুর চেয়ে মানুষের জীবনে বড় ট্রাজেডী নেই। প্রিয়জনের মৃত্যুও ট্রাজেডী। কিন্তু এই ঘটনায় মানুষের ভূমিকা গৌণ। স্বপ্নের মৃত্যুর জন্য মানুষই দায়ী। রাষ্ট্রপতি বিজ্ঞানী আবদুল কালামের স্বপ্ন দেখাই ছিল তার বড় মহত্ব এবং বিশালত্ব। জীবন ব্যাপী সমগ্র জাতিকে স্বপ্ন দেখিয়েছেন। তাঁর স্বপ্ন আত্মজয়ের, ভারতের বিশ্বজয়ের, মহাকাশ জয়ের। স্বপ্ন দেখতেন মানুষের অসীম শক্তির বিকাশ সাধনের।

বাংলাদেশ সফরকালে বিজ্ঞানী আবদুল কালাম ঢাকায় মেধাবী ছাত্র-ছাত্রীদের উদ্দেশ্যে ১৭ অক্টোবর ২০১৪ সালে এক অনুষ্ঠানে বললেন, ‘তোমাদের স্বপ্ন বাংলাদেশের স্বপ্ন। তোমাদের চিন্তা বাংলাদেশের চিন্তা। আজ আমি সত্যিই আনন্দিত কারণ তোমাদের মত মেধাবী তরুণ আমার মত ৮৩ বছরের একজন বৃদ্ধের কথা মনোযোগ দিয়ে শুনতে এসেছো। এই রুমে আলো জ্বলছে, আলোর ঝলকে বর্ণিল হয়ে উঠেছে সব জায়গা। এই বাতি আবিষ্কার করেছিল থমাস আলভা এডিসন। এই বাতি যতদিন জ্বলবে ততদিন আমরা তাঁকে মনে রাখবো। আমাদের পকেটে সেলফোন আছে, এটি আবিষ্কার করেছিল আলেকজান্ডার গ্রাহামবেল। তাঁকে সবাই ভালোভাবে মনে রেখেছে। জীবনে তোমরা এমন কিছু করবে যাতে সবাই স্মরণ করে। স্বপ্ন দেখ, বড় স্বপ্ন দেখ। স্বপ্ন দেখতে হলে আলেকজান্ডার গ্রাহামবেল, থমাস আলভা এডিসন, জগদ্বীশ চন্দ্র বসুর মতই দেখ।… ব্যর্থগুলো প্রতিহত করার যোগ্যতাই প্রকৃত নেতৃত্ব।

বাংলাদেশে এসে তিনি সফলতার গল্প শুনালেন। তিনি পি এইচ ডি ডিগ্রীধারী, বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক, দার্শনিক বা বিজ্ঞানীর কথা আমাদের শুনালেন না, শুনালেন একজন প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকের কথা। সফলতার শিক্ষা যে প্রাথমিক শিক্ষক হতে পেয়েছেন তা তিনি নির্দ্বিধায় স্বীকার করেছেন এবং শ্রদ্ধা জানিয়েছেন যে শিক্ষককে। সফলতার পাহাড় শৃঙ্গে যিনি উঠেছেন তার পক্ষে ৭৫ বছর পূর্বের এক অখ্যাত প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষককে স্মরণ করার কী প্রয়োজন ছিল? তিনি আমাদের শিখিয়ে গেলেন, যিনি স্বপ্ন দেখান, ভিতরে ভিতরে নির্মাণ করেন,তাঁকে ভুলে যাওয়া অন্যায়।

আবদুল কালাম মনে করতেন, মানুষের মধ্যে আছে অসাধারণ শক্তি। যে শক্তি বিকাশের কথা বলতেন গুরুত্বের সাথে। তিনি বলেছেন, ‘প্রত্যেক মানুষই কিছু না কিছু আগুন নিয়ে জন্মায়, মানুষের উচিৎ সে আগুন বিকশিত করে ছড়িয়ে দেয়া’। তাই তিনি তাঁর বিখ্যাত বইয়ের নাম দিয়েছেন, ‘উয়িংস অব ফায়ার’। আগুনের ডানা। যে ডানা আপনাকে পুড়তে হবে’। সে ডানা প্রসার করতে পারলে অনেক ওপরে উঠতে পারে, উড়তে পারে আকাশে, মহাকাশে। তিনি আরো বলেছেন, ‘সূর্য্যের ন্যায় উজ্জ্বল আলো ছড়াতে চাইলে সূর্য্যের ন্যায় আপনাকে পুড়তে হবে’।

জীবনে তিনি হতে চেয়েছিলেন বিমান চালক। ক্লাসের আট জন নির্বাচিত হয়েছিলেন বিমান চালক। আবদুল কালাম হয়েছিলেন নবম। বিমান চালক হতে পারেনি তাতে কি। একটি পথ বন্ধ হলেও কত পথ খোলা আছে তা তিনি জানতেন। নিজের অদম্য চেষ্টায় হয়ে উঠেন ভারতের ক্ষেপণাস্ত্র ও পরমাণু বিজ্ঞানের প্রাণ পুরুষ এবং রাষ্ট্রপতি। তিনি কর্মজীবনে শুধু মাত্র দুইদিন ছুটি নিয়েছিলেন। মায়ের আর বাবার মৃত্যুদিনে। মৃত্যুর পূর্বে বলে গিয়েছিলেন, ‘আমার মৃত্যুতে ছুটি ঘোষণা করো না। আমাকে যদি ভালোবাস, মন দিয়ে কাজ করো সেদিন। আমার মৃত‍্যুর কারণে যেন ভারত একদিন পিছিয়ে না যায। আসলে এটি ছিল দেশপ্রেম। মহামতি প্লেটোর কাছে জানতে চেয়েছিলেন, দেশপ্রেম কি? তিনি জানিয়েছিলেন, ‘প্রত্যেকই নিজের দায়িত্বটাকে সুচারুরূপে পালন করাই সর্বোচ্চ দেশপ্রেম।

এ পি জে আবদুল কালাম রাষ্ট্রপতি হয়েও ছাত্র-ছাত্রীদের মাঝে সময় কাটাতেন বেশি। তার কারণ জানতে চাইলে তিনি বলতেন, ‘যেখানে বসে আছে আগামী দিনের ভারত শাসক, দার্শনিক, বিজ্ঞানী, সাহিত্যিকগণ সেখানে সময় কাটানোর চেয়ে রাষ্ট্রপতির চেয়ারে বসে সময় কাটানোর আমার কাছে গুরুত্ব অধিক নয়’। তিনি ছাত্র-ছাত্রীদের বলতেন ‘চাকুরীপ্রার্থী নয় চাকুরীদাতা হও’।

তাঁর বড় হওয়ার পিছনে তাঁর বাবার একটি কথা জীবনে রেখাপাত করেছিল। তাঁর বাবা বলতেন, ‘তোমার সন্তান তোমার নয়, তারা প্রবাহমান জীবনের অংশ। তারা তোমাদের মাধ্যমে জন্ম নিয়েছে মাত্র’।

এ পি জে আবদুল কালামের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সাড়া জাগানোর উক্তি উল্লেখ করার লোভ সংবরণ করতে পারলাম।
(১) যে অন্যকে জানে সে শিক্ষিত কিন্তু জ্ঞানি হলো সেই ব্যক্তি যে নিজকে জানে। জ্ঞান ছাড়া শিক্ষা কোন কাজে আসে না।
(২) স্বপ্ন দেখ, কারণ স্বপ্ন চিন্তায় পরিণত হয়। চিন্তা মানুষকে কর্মে অনুপ্রাণিত করে।
(৩) একটি ভালো বই একশত বন্ধুর সমান আর একজন ভালো বন্ধু একটি লাইব্রেরীর সমতুল্য।
(৪) হাসতে হবে প্রাণখুলে। জীবনে হাসতে পারাটা খুব দরকার। হাসি জীবনকে সহজ করে। কঠিন সময় পার করতে সহায়তা করে।
(৫) প্রেসিডেন্ট হিসেবে আমার কাছে সবচেয়ে কঠিন কাজ আদালতের দেওয়া মৃত্যুদণ্ডের রায়ে সম্মতি দেওয়া। আমি মনে করি পারিবাশ্বিক অবস্থার কারণে মানুষ অপরাধ করে। অপরাধের জন্য দায়ী সমাজ বা অর্থনৈতিক অবস্থা। কিন্তু সে ব্যবস্থাকে আমরা শাস্তি দিতে পারি না। শাস্তি দিই ব্যবস্থার স্বীকার মানুষদের।
(৬) যুব সমাজের প্রজ্বলিত মন পৃথিবীর ওপর গভীর শক্তিশালী মূলধন।
(৭) তুমি সমস্যার অধিনায়ক হও, সমস্যাকে পরাজিত কর।
(৮) তোমাদের প্রশ্ন করতে চাই কী জন্য মানুষ তোমাকে মনে রাখলে খুশি হবে।
(৯) ফুলকে দেখ, কী অকৃপণ ভাবে সুগন্ধ আর মধুদান করে। কিন্তু যখন তার কাজ শেষ হয়ে যায়, নিঃশব্দে ঝরে পড়ে।
আবদুল কালাম মেঘালয়ের তরুণ ছাত্র-ছাত্রীদের এক অনুষ্ঠানে বক্তৃতারত অবস্থায় অসুস্থ হয়ে নিচে পড়ে যান। হাসপাতালে নিয়ে গেলে সেখানেই হয় তাঁর মহাপ্রয়াণ। সারা জীবন ছাত্রদের মাঝে আলো বিতরণ করতে করতে ছাত্রদের কোলাহলেই বিদায় নিলেন। অসাধারণ কর্মের মাধ্যমে তিনি মৃত্যুকে আলিঙ্গন করলেন। সামরিক বাহিনীতে কর্মের মধ্যে মৃত্যুবরণ করলে বলা হয়, To die with boots on. ইউনিফর্ম পরিহিত অবস্থায় সৈনিকের মৃত্যু। আবদুল কালামের মৃত্যু যেন আলোকিত মানুষের আলো বিতরণরত মহান এক সৈনিকের মহাপ্রয়াণ।মহান আল্লাহ পাক তাঁকে জান্নাত নসিম করুন।

লেখক: কলাম লেখক, রাজনীতিক

আরও খবর 23

Sponsered content