প্রতিনিধি ২ এপ্রিল ২০২৬ , ১২:৫৩:২১ প্রিন্ট সংস্করণ

চট্টবাণী ডেস্ক: গণভোটের সংস্কার প্রস্তাব এবং পরিষদ গঠন নিয়ে সরকারের পক্ষ থেকে কোনো সিদ্ধান্ত না আসায় জাতীয় সংসদের অধিবেশন থেকে ওয়াকআউট করেছে বিরোধীদল।
বুধবার (১ এপ্রিল) সংসদে অধিবেশন চলাকালে বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমানের নেতৃত্বে প্রতিবাদস্বরূপ বিরোধীদলের এমপিরা সংসদ কক্ষ ত্যাগ করেন।
অধিবেশনে বিরোধীদলীয় নেতা অনির্ধারিত আলোচনায় দাঁড়িয়ে আইনমন্ত্রীকে উদ্দেশ্য করে বলেন, তিনি তার বক্তব্যে সম্ভবত আমার কথাটা ভালো করে খেয়াল করেননি। আমার তাই মনে হয়েছে।
ইচ্ছাকৃতভাবে তিনি বলেছেন— আমি এটা বিশ্বাস করতে চাই না।
‘আমি যা বলেছি, সেটার বাইরে গিয়ে তিনি গতকাল একটি প্রশ্ন করেছেন। গতকাল যে এজেন্ডাটি আমরা উত্থাপন করেছিলাম, সেটা ছিল মূলত গণভোট এবং গণভোট সংস্কার সংক্রান্ত প্রস্তাব। এর আলোকে যে পরিষদটি গঠন হওয়ার কথা, সেই পরিষদের সভা আহ্বান সংক্রান্ত বিষয়ই ছিল মূল নোটিশের বিষয়।
’
ডা. শফিকুর রহমান বলেন, একপর্যায়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী একটি প্রস্তাব দিয়েছেন। এই প্রস্তাবে আমার বক্তব্যে সাড়া দিতে গিয়ে বলেছিলাম, যেহেতু আলোচনাটি হয়েছে সংস্কার পরিষদকে কেন্দ্র করে, যদি এটিকে ঘিরে কোনো বিশেষ কমিটি গঠন করা হয়, তাহলে আমরা ইতিবাচকভাবে তা ভেবে দেখব এবং একই সঙ্গে বলেছিলাম, সেখানে সরকারি দল এবং বিরোধীদল থেকে সমান সংখ্যক সদস্য নেওয়া হলে এটি একটি অর্থবহ কমিটি হিসেবে গড়ে উঠবে বলে আমরা বিশ্বাস করি। যেহেতু আমরা এখানে এসেছি সংকট নিরসনের জন্য, সংকট তৈরির জন্য নয়।
‘এর উত্তরে তিনি (আইনমন্ত্রী) তার বক্তব্য দিয়েছেন।
আমার বক্তব্য যেহেতু আগে হয়ে গেছে, বিষয়টি আমি পরিষ্কার করলাম। কিন্তু যেহেতু এটি জন-আকাঙ্ক্ষার বিষয়, গণভোটের বিষয়, প্রায় ৭০ শতাংশ মানুষের রায়ের বিষয়— আমরা প্রত্যাশা করেছিলাম, আপনার মাধ্যমেই প্রতিকার পাব এবং সিদ্ধান্তের জন্য আমি আপনাকে আহ্বান জানিয়েছিলাম। কিন্তু কোনো সিদ্ধান্ত হয়েছে কি না, আমি বুঝতে পারিনি। এই বিষয়টি আপনার কাছ থেকে আমি স্পষ্ট জানতে চাই।’
এ সময় স্পিকার হাফিজউদ্দিন আহমেদ বলেন, কালকের প্রস্তাবটি ছিল একটি মুলতবি প্রস্তাব, যা আমার অনুপস্থিতিতে গৃহীত হয়েছিল।
বাংলাদেশের ৫৩ বছরের সংসদীয় ইতিহাসে মাত্র তিনটি মুলতবি প্রস্তাব গৃহীত হয়েছে। একটি আনোয়ার হোসেন মঞ্জুর, অপরটি গ্রেনেড হামলা সম্পর্কিত এবং আরেকটি ছিল নূর ইসলাম মনির কোস্টগার্ড সম্পর্কিত। বছর পর বছর চলে যায়, কোনো মুলতবি প্রস্তাব সংসদে গৃহীত হয় না। তারপরও প্রাণবন্ত আলোচনার জন্য ডেপুটি স্পিকারের সভাপতিত্বে মুলতবি প্রস্তাবটি গ্রহণ করা হয়েছিল। আপনি জানেন, যে সমস্যার সমাধান আইন প্রণয়নের মাধ্যমেই করা যায়, তা নিয়ে মুলতবি প্রস্তাব হতে পারে না। তারপরও উদারভাবে বিরোধীদলকে কথা বলার সুযোগ দেওয়ার জন্য এটি গ্রহণ করা হয়েছে। আরও একটি কথা বলতে চাই— এই বিষয়ে আরও একটি মুলতবি প্রস্তাবের নোটিশ আজ আমরা বিবেচনা করব। আপনাদের মধ্যে যদি কোনো বক্তব্য বাকি থাকে, আমি বলেছিলাম যে তা আগামীকাল বলা যাবে। আজও যদি প্রয়োজন হয়, ওই নোটিশটি নিয়ে আলোচনার সময় আপনারা কথা বলার অবারিত সুযোগ পাবেন। এটি একটি জাতীয় সমস্যা— যত গুরুত্বপূর্ণ বিষয় আছে, আমরা আশা করি ট্রেজারি বেঞ্চ এবং বিরোধীদল মিলেই খোলামেলা আলোচনার মাধ্যমে সিদ্ধান্ত নেবেন। এটি জনগণের মহান সংসদ। আপনারাই সিদ্ধান্ত নেবেন। রুলস অব প্রসিডিউর অনুসারে আমরা যেন পরিচালিত হতে পারি।
তখন বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, প্রতিকার চেয়েছিলাম। এই বিষয়টি কোনো দলের সঙ্গে সম্পর্কিত নয়। নির্বাচনের আগে সরকারি দল ও বিরোধীদল সবাই এ বিষয়ে একমত হয়েছিল এবং এর পক্ষে প্রচারও চালিয়েছে। কিন্তু আমরা প্রতিকার পেলাম না। এতে দেশবাসীর রায়ের প্রতিফলন হলো না, মূল্যায়ন হলো না। আমরা বিরোধীদলে বসে এই অবমূল্যায়ন মেনে নিতে পারি না। এ কারণে এর প্রতিবাদে আমরা ওয়াকআউট করছি।’
স্পিকার বলেন, ‘আপনি আমার বক্তব্য সম্পূর্ণ করতে দিলেন না। আমি আপনার পুরো বক্তব্য শুনেছি। আপনারা ওয়াকআউট করতে পারেন— এটি আপনাদের অধিকার। তবে আমি বলতে চাই, আজ একটু পরেই আরেকটি মুলতবি প্রস্তাব বিবেচনা করা হবে। সেখানে আমার মনে হয়, আপনারা আপনাদের প্রশ্নের উত্তর পেয়ে যাবেন এবং সেখানে মন খুলে আরও কথা বলতে পারবেন। সুতরাং আমার অনুরোধ— আপনারা সেটি শুনুন, তারপর যদি ওয়াকআউট করতে চান, প্লিজ ফিল ফ্রি। আগে প্রস্তাবটির ভাগ্য কী নির্ধারিত হয়, তা একটু অপেক্ষা করে দেখুন।’
স্পিকারের এ বক্তব্যের পর বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, ওই নোটিশটিও আমাদের নজরে কিছুটা এসেছে। এবং আমরা মনে করি, মূল নোটিশকে চাপা দেওয়ার জন্যই ওই নোটিশ সামনে আনা হয়েছে। এ কারণে দুইটির প্রতিবাদেই আমরা এই সংসদ থেকে আপাতত ওয়াকআউট করছি।
স্পিকার তখন বলেন, নোটিশই তো এখনও উত্থাপন করা হয়নি— আপনি কীভাবে বুঝলেন এটি মূল নোটিশকে চাপা দেওয়ার জন্য আনা হচ্ছে? আমি অনুরোধ করছি, একটু ধৈর্য ধরে অপেক্ষা করুন, নোটিশের বিষয়বস্তু শুনুন, তারপর আপনারা চাইলে ওয়াকআউট করুন।
প্রত্যুত্তরে বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, মাননীয় স্পিকার, আপনার অনুপস্থিতিতে এই হাউসে নোটিশটি পড়া হয়েছে। সংশ্লিষ্ট সদস্য এটি পড়েছেন, আমরা শুনেছি। এ কারণেই আমরা বুঝে-শুনেই বলছি যে, এই দুই কারণেই আমরা এখন ওয়াকআউট করছি।
তখন স্পিকার বলেন, নিশ্চয়ই সংসদীয় রীতি অনুযায়ী আপনারা ওয়াকআউট করতেই পারেন— ফিল ফ্রি।
পরে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ তার বক্তব্যে বলেন, সংসদীয় সংস্কৃতিতে ওয়াকআউট একটি স্বাভাবিক বিষয়, তবে আলোচনার মাধ্যমেই সব সমস্যার সমাধান সম্ভব।
বিরোধীদলের অনুপস্থিতিতেই সংসদের পরবর্তী কার্যক্রম চলমান থাকে।