প্রতিনিধি ২৬ জুন ২০২৫ , ১১:৩৬:৩২ প্রিন্ট সংস্করণ

চট্টবাণী: গত ১১ই জুন দুপুরে আমি চট্টগ্রাম শহরের কোতোয়ালি এলাকা থেকে আগ্রাবাদ গন্তব্যে যাওয়ার জন্য ৬নং লোকাল বাসে উঠি। পুরাতন রেল স্টেশন এলাকায় আরো সাত-আট জন যাত্রী একসাথে উঠায় বাসে প্রচণ্ড ভিড় হলো। আমি হাতে ধরেই মোবাইল ব্যবহার করছিলাম। পুরাতন রেল স্টেশনের ফলমন্ডি স্থানে ১২ টা ৪৮ মিনিটের হঠাৎ করে একজন লোক আমার হাত থেকে মোবাইলটি টান দিয়ে নিয়ে দ্রুত বাস থেকে নেমে দৌড় দেয়। এত দ্রুত ঘটনা ঘটে যে কিছু বুঝে ওঠার আগেই সে চোখের আড়াল হয়ে যায়। আমি প্রথমে হতবাক হয়ে যাই। ঘটনার সময় একজনকে ধরতে পারলেও গাড়ির হেলপার ও অন্যান্য যাত্রীরা সহযোগিতা না করায় চোরকে আটকানো যায়নি। চালক বা হেলপার কেউই সাহায্যের জন্য এগিয়ে আসেননি। এমনকি বাসে থাকা কোনো যাত্রী আমাকে সহযোগিতা করেনি। ৬ নাম্বার বাসে যাতায়াত কম থাকায় আমার পূর্ব অভিজ্ঞতা ছিল না।
উপায়ন্তর না দেখে অবশেষে আমি কোতোয়ালি থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি নং-৬৯৬) করি। থানায় এসে দেখতে পাই আমার মত এরকম আরো বেশ কয়েকজন মানুষও এমন পরিস্থিতির শিকার হয়ে সাধারণ ডায়েরি করতে এসেছেন। বুঝতে পারলাম এটি কোনো সাধারণ ছিনতাই নয়। একটি সংঘবদ্ধ চক্র নিয়মিতভাবে এই রুটে যাত্রীদের টার্গেট করছে। ঈদ পরবর্তী রাস্তাঘাটে শহরমুখী মানুষকে টার্গেট করে এ চক্রটি। এসব এলাকায় চোর চক্র, পকেটমার, ছিনতাইকারী, ঝাপটা বাজদের একটি বড় সিন্ডিকেট রয়েছে। যারা নেশা জাতীয় দ্রব্য বেচাকেনা থেকে শুরু করে নানা অপরাধের যুক্ত রয়েছেন। এরা বিভিন্ন দলে উপদলে বিভক্ত হয়ে যাত্রীবাহী বাস এবং পথচারীদেরকে টার্গেট করে তাদের গুরুত্বপূর্ণ মালামালসহ মোবাইল মানিব্যাগ ছিনতাই করে। একটু আগেও আপনি কথা বললেন, ম্যাসেজ দেখলেন, চ্যাটে ছিলেন। বড় সিন্ডিকেট কিছু বুঝে ওঠার আগেই দেখলেন মোবাইল হাওয়া হয়ে গেছে। নগরীর বাসে, নির্জন পথে এখন এমনটাই দৃশ্য। মোবাইল চোর ছিনতাইকারী চক্র থাকে আপনার পাশে ওৎ পেতে রয়েছে।
আবার চুরি যাওয়া এসব মালামাল বিক্রি হয় ‘ওপেন সিক্রেট’ চোরাই মার্কেটে। অন্য কোনো নাম নেই বলা হয় ‘চোরাই মার্কেট’। চট্টগ্রাম নগরীর কোতোয়ালি থানার নতুন ও পুরাতন রেল স্টেশনের মাঝামাঝি এলাকা এবং আশপাশের ফুটপাতজুড়ে গড়ে উঠেছে এ মার্কেট। এখানকার দোকানিদের কাছে ঠিকানা জানতে চাইলেও তারা অকপটে জানায় ‘চোরাই মার্কেট’। কেউ কেউ বলেন ঘর বা দোকান থেকে চুরি হয়ে যাওয়া মোবাইল চোরাই মার্কেটে নগদের বিনিময়ে ফেরতও পাওয়া যায়। জিনিসটা নিজের বাসা কিংবা দোকানের এমন দাবি করলে উলটো গণপিটুনি খাওয়ার সম্ভাবনা থাকে। চোরাই মার্কেটে কীভাবে ব্যবসা করেন, এসব পণ্য কোথা হতে আসে তা অজানা থাকার কথা নয় | প্রশাসন কর্তৃক মাঝেমধ্যে অভিযান চালানো হয়। অভিযানে বাস কিংবা অন্যান্য পরিবহনে যাত্রীরা যেন গাড়ির জানালার পাশে কানে মোবাইল ফোন না রেখে পকেটেই রাখা এবং যাত্রীদেরকে এ ব্যাপারে সতর্ক থাকার তাগিদ দেয়া হয়। অভিযানের পর দিনকয়েক সাবধানে চলে ব্যবসা। তারপর আবার শুরু হয় পুরোদমে। চট্টগ্রামের প্রধান রেলওয়ে স্টেশনের পাশাপাশি বিভিন্ন রুটের বাসের কাউন্টার রয়েছে। এ কারণে চোর, ছিনতাইকারী বা পকেটমারের উৎপাত বেশি এ জংশনে। চট্টগ্রামের নতুন ও পুরাতন রেল স্টেশনের মাঝামাঝি এলাকা থেকে টাইগারপাস পর্যন্ত এলাকা এখন মোবাইল চোর চক্রের আখড়া। প্রতিদিন এই এলাকা থেকে শত শত মানুষের নামিদামি বিভিন্ন ব্রান্ডের মোবাইল, মানিব্যাগ, গুরুত্বপূর্ণ মালামাল ঝাপটা বাজরা কৌশলে নিয়ে নিচ্ছে। কোতোয়ালি ও নিউমার্কেট মোড় এলাকা থেকে যাত্রীরা গাড়িতে উঠলেই এসব চোর চক্র ও ঝাপটা বাজরা গাড়ির যাত্রী কিংবা পথচারীদেরকে টার্গেট করে। বেশির ভাগ সময় এসব এলাকায় সঙ্গবদ্ধ চোর চক্র ঠেলাঠেলি করে গাড়িতে উঠেই যাত্রীদের মোবাইল, মানিব্যাগ ও মূল্যবান জিনিস নিয়ে নেয় । তবে মজার ব্যাপার হচ্ছে কেউ এর প্রতিবাদ করলে সঙ্গবদ্ধ চোর চক্র উলটো লোকজনকেই চোর সাজিয়ে দেয়। বিষয়টি এমন যে, চোরচক্র মোবাইল মানিব্যাগ নিয়ে দৌড়ায়, অসহায় পাবলিক জিডি করতে যায়।
চোরা মার্কেটের ব্যাপক প্রসার ও পরিচিতি পায় ২০০০ সালের পরে। দেশের মোবাইল ফোনের ব্যবহার বৃদ্ধির সঙ্গে জমজমাট হয়ে ওঠে বেচাকেনা। পকেটমার থেকে ছিনতাই অথবা বাসা-বাড়ি থেকে চুরি যাওয়া সব মোবাইল এখানে এনে বিক্রি করা হতো। অল্প দামে মোবাইল বিক্রির কারণে দ্রুত পরিচিতি পায়। পুরাতন স্টেশন থেকে নতুন স্টেশন পর্যন্ত কয়েকশো মিটার এলাকার ফুটপাতজুড়ে শতাধিক দোকানে শোভা পায় হাজার হাজার চোরা মোবাইল। বাটন মোবাইল থেকে শুরু করে নামকরা ব্র্যান্ডের স্মার্টফোন বেচাকেনা হয়। চার্জার, ক্যাবল, ব্যাটারি বা এয়ার ফোনের মতো পণ্যও এখানে বিক্রি হয়। মোবাইল চুরির পর আইএমইআই নাম্বার পরিবর্তন করে বিক্রি করা হয়। সাধারণত ভিড়ের মধ্যে, বিশেষ করে গণপরিবহন যেমন বাস, ট্রেন, এবং জনসমাগমপূর্ণ স্থান শপিংমল, মসজিদ, বিয়ে অনুষ্ঠান, সভা সমাবেশে, পর্যটন এলাকা এবং মেট্রোতে মোবাইল চুরির ঘটনা বেশি ঘটে থাকে। এছাড়াও, কিছু নির্দিষ্ট স্থান যেমন চট্টগ্রামের নিউ মার্কেট, রেলস্টেশন, আগ্রাবাদ, ইপিজেড, ২নং গেইট, নতুন ব্রিজ এর আশেপাশে মোবাইল চুরির প্রবণতা বেশি। এ সব জায়গায় মানুষ মোবাইল নিয়ে ভয়ে চলা ফেরা করতে হচ্ছে। মোবাইল চুরি এখন দেশের জাতীয় সমস্যায় পরিণত হতে চলেছে যা সবার জন্যই একটি অশনিসংকেত।
২২ জুন, ২০২৫ তারিখে প্রকাশিত দৈনিক শাহ আমানত পত্রিকায় তথ্যে দেখা গেছে চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশের তথ্য অনুযায়ী অক্টোবর, ২০২৫ মাসে সিএমপির চার জোনের ১৬ থানায় ২ হাজার ৬৯৭ টি মোবাইল হারানো/ ছিনতাই অভিযোগের জিডির বিপরীতে পুলিশ প্রশাসন শুধুমাত্র ১২৯ টি মোবাইল উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে। এ সঙখ্যাটি মোট ঘটনার মাত্র ৪.৮% যা অত্যান্ত নগণ্য এবং জনসাধারণের নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন তোলে। এ পরিস্থিতি আমাদের সচেতন করে তোলে যে, শুধুমাত্র পুলিশ প্রশাসনের ওপর নির্ভর না করে আমাদের সমাজকেই সচেতন, সংগঠিত ও প্রতিরোধমূলক ভূমিকা নিতে হবে। মোবাইল চুরি ফলে আর্থিক ক্ষতি, মানুষিক যন্ত্রণাসহ মানুষের অতীব মূল্যবান তথ্য হারিয়ে বিভিন্ন ক্ষতি ও ঝুঁকিতে পড়তে হচ্ছে। মোবাইল চোর চক্র/ গ্যাং এর অপতৎপরতা বন্ধ করতে তাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ পদক্ষেপ নেয়া জরুরি। কারও সংস্পর্শ নিয়ে এসব সংঘবদ্ধ চোর চক্র চুরি-ছিনতাই করছে কিনা তা খুঁজে বের করতে হবে। মোবাইল চোর চক্রের ভয়াবহতা চলমান থাকলে ভবিষ্যতে অপরাধজগতের মাত্রা বৃদ্ধি পেয়ে ভয়াবহ রূপ ধারণ করবে। পুলিশ বাহিনী মোবাইল চোর চক্র দমন করতে ব্যর্থ হলে মোবাইল চুরি বন্ধে সরকার, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, গণমাধ্যম, বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, নাগরিক সমাজ, সুশীল সমাজ, রাজনৈতিক দলসহ সবার সম্মিলিতভাবে এগিয়ে আসা প্রয়োজন। মোবাইল চুরি রোধে সমবেত কণ্ঠে প্রতিবাদ প্রয়োজন। সর্বোপরি সমাজ ও জাতির বৃহত্তর স্বার্থে মোবাইল চুরি বন্ধে গণপ্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে।
নুরুল মুহাম্মদ কাদের
কলামিস্ট ও সংগঠক।