প্রতিনিধি ৩১ জুলাই ২০২৫ , ১০:০১:০৫ প্রিন্ট সংস্করণ

চট্টবাণী: মানুষ দাস প্রথাকে পরাজিত করেছে, বর্ণবাদকে পরাজিত করেছে, দরিদ্রতাকে পরাজিত করতে পারেনি। দরিদ্রতাকে পরাজিত করতে না পারলে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করা যায়। দরিদ্র মানুষের মানবাধিকার থাকে না। প্রকৃত গণতন্ত্র হলো শোষিতের গণতন্ত্র। গণতন্ত্র একটি উৎকষ্ট মতবাদ। গণতন্ত্রের দোষ আছে কিন্তু বিকল্প নেই। মনীষীরা বলে গেছেন, গণতন্ত্রের সঙ্কট উত্তরণ গণতন্ত্র দিয়ে, অধিকতর গণতন্ত্র দিয়ে।গণতন্ত্রের সঙ্কট উত্তরণের বিকল্প নেই। নোবেল বিজয়ী সাহিত্যিক বৃটিশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী চার্চিল বলেছেন, ‘গণতন্ত্র এমন একটি খারাপ জিনিস, রাষ্ট্রশাসনের জন্য তার চেয়ে উত্তম ব্যবস্থা আজো আবিষ্কার হয়নি। আব্রাহাম লিঙ্কন বলেছেন, অনেক মতবাদের মৃত্যু হবে, কিন্তু গণতন্ত্রের মৃত্যু দুনিয়া হতে কোন দিন হবে না। অধিকাংশ ক্ষেত্রে এই গণতন্ত্রকে আমরা শুধু নির্বাচনের মধ্যে সীমাবদ্ধ করে রাখি। নির্বাচন মানে গণতন্ত্র নয়। নির্বাচন হলো গণতন্ত্রের অনুসঙ্গ। নির্বাচিত সরকার হলেই গণতান্ত্রিক সরকার হয় না। নির্বাচিত সরকার হলে যদি গণতান্ত্রিক সরকার হতো তাহলে দুনিয়ার সবচেয়ে নিন্দিত ব্যক্তি হিটলার-মোসেলিনি হতো সবচেয়ে বড় গণতান্ত্রিক। দুনিয়ার বহু সরকার নির্বাচিত হয়ে স্বৈরাচারে রূপ নিয়েছে। প্রকৃত গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করতে মানবাধিকার প্রতিষ্ঠা করতে হয়। মানুষের মৌলিক অধিকারসহ সমস্ত অধিকার প্রতিষ্ঠা করা না গেলে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করা যায় না। মানবাধিকারহীন গণতন্ত্র মানুষের কোন কল্যাণ বয়ে আনতে পারে না। প্রাচীন কালে দ্বন্দ্ব ছিল রাষ্ট্র কার,পোপের না না রাজার? এক সময় রাজার জয় হয়। তারপর দ্বন্দ্ব হয় রাষ্ট্র কী রাজার না জনগণের! ফরাসী বিপ্লবের মাধ্যমে প্রমাণিত হয় রাষ্ট্র জনগণের। জনগণের রাষ্ট্রে সমস্ত মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠা করা না গেলে জনগণের রাষ্ট্র দাবি করা যায় না।
গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের সংবিধানে মানবাধিকারের কথা লেখা থাকে। মানবাধিকার আন্দোলন মানে সাংবিধানিক দায়িত্ব পালন করা। অধিকার চাইলে মানবাধিকার কী তা বুঝতে হবে। আমাদের দেশের অধিকাংশ মানুষ জানে না মানবাধিকার কী জিনিস। মানবাধিকার রক্ষা করতে হলে আগে জানতে হবে মানুষের অধিকার সম্পর্কে। মানবাধিকার সংগঠনের কাজ মানুষের অধিকার সম্পর্কে সচেতন করা। অধিকার শিখার মাধ্যমে মানুষের মুক্তি আসবে। কারণ শিক্ষা আনে চেতনা, চেতনা আনে বিপ্লব, বিপ্লব আনে মুক্তি।
ম্যান অর উইম্যান হলে মানুষ হয় না। প্রকৃত মানুষ হতে হলে হিউম্যান (মনুষ্যত্ব) থাকতে হয়। প্রাচীন কালে মানুষের মৌলিক অধিকার পূর্ণ করা সম্ভব দিল না। তখন মানবাধিকার সংগঠন করা কঠিন ছিল। বর্তমান মানবাধিকার সংগঠন বাড়ছে,কমছে না অপকর্ম,বাড়ছে ‘আইন’,কিন্তু কমছে না অপরাধ।
আমাদের দেশে প্রচুর মানবাধিকার সংগঠন আছে। অনেক সংগঠনে কর্মী মানবাধিকারকে অপমানিত করে। তারা নিজেরাই মানবাধিকার বিরোধী কাজ করেন। অনকে নিজের পরিবারে মানবাধিকার দিতে পারে না কিন্তু পরিচয় দেন মানবাধিকার কর্মী। এসব মানুষ দিয়ে মানবাধিকারের বিন্দু পরিমান কাজ করা যাবে না। আমরা মানবাধিকারের সভা করি, সমাবেশ করি, সেমিনার করি, তা ভালো কাজ। কারণ মানবাধিকার বিষয়ে কাজ করার আগে আমাদের মানবাধিকার সম্পর্কে জানতে হবে,বুঝতে হবে। কিন্তু তার চেয়ে বড় বিষয় হলো মানবাধিকার সম্পর্কে জেনে আমরা মাঠে কতটুকু কাজ করলাম তা সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। মাঠে কাজ করতে না পারলে সমস্ত আয়োজন ব্যর্থ হতে বাধ্য। নেতা হওয়া সহজ কিন্তু আদর্শের কর্মী হওয়া কঠিন। যে সব কর্মী নিজের পরিবারে মানবাধিকার রক্ষা করতে পারে না, তাদের দিয়ে ভালো কিছু করা সম্ভব নয়। সংগঠন করতে যোগ্যতা থাকলে হয় না, বিশ্বস্ত কর্মী বাহিনী বেশি প্রয়োজন। যোগ্যলোক বেতন দিয়ে, পত্রিকায় বিজ্ঞাপন দিয়ে পাওয়া যায়, কিন্তু বিশ্বস্ত আদর্শের কর্মী পাওয়া খুব কঠিন। বাস্তব জীবনের অভিজ্ঞতা বলে, বিশ্বস্তহীন বহু যোগ্য লোকের দ্বারা যত সংগঠনের ক্ষতি হয়েছে তত লাভ হয়নি। বিশ্বস্তহীন কর্মীরা সংগঠন গড়ার চেয়ে ভাঙে বেশি। সংগঠন করতে গিয়ে নৈতিকতার বিষয়টি ছোট নয়। মানবাধিকারের সর্বজনী ঘোষণা অনুযায়ী মানুষের অধিকার হলো ৩০টি, যার মধ্যে ২৪টি নাগরিক অধিকার, ৬টি অর্থনৈতিক, সামাজিক, সংস্কৃতিক অধিকার। আমাদের দেশের মৌলিক অধিকারের সংখ্যা ১৮টি তার মধ্যে ১২টি নাগরিক অধিকার আর ৬টি দেশের হোক বিদেশের হোক সবার জন্য প্রযোজ্য। এসব অধিকার যতদিন বাস্তবায়ন করা যাবে না ততদিন গণতন্ত্র প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পাবে না।
আমরা এখন একুশ শতকে। এ যুগ তথ্যপ্রযুক্তি, মিডিয়া, বিজ্ঞান-প্রযুক্তিসহ মানুষের অসীম ক্ষমতার প্রকাশের যুগ। অনেক কিছুতে এগিয়ে গেলেও মানবাধিকার প্রতিষ্ঠায় কতটুকু এগিয়েছি? আমরা বেশিদূর এগোতে পারিনি। আধুনিক বিশ্বে এখনো কোন দেশে পূর্ণাঙ্গরূপে মানবাধিকার প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব হয়নি। কিন্তু যেখানে. মানবাধিকার লঙ্ঘনের মাত্রা ছাড়িয়েছে সেখানে প্রতিরোধ হয়েছে। অপরাধ সম্পূর্ণরূপ নির্মূল করা ‘সোনার পাথর বাটি’ কিন্তু অপরাধ নিয়ন্ত্রণ করা কাঁঠালের আসমত্ত্ব নয়।
বিশাল ভারতে যারা নেতৃত্বদেন, তাদের সমকক্ষ নেতা আমাদের দেশে জন্ম হয় না তা নয়। যোগ্য দক্ষ নেতারাও এদেশে বেশি কিছু ইচ্ছা করলে করতে পারে না। কারণ ভারতের মত শক্তিশালী নির্বাচন কমিশন, মানবাধিকার কমিশন, দুর্নীতি দমন কমিশন, স্বাধীন সুপ্রিম কোর্ট,শক্তিশালী সংবাদ মাধ্যম, গণতন্ত্রের ধারাবাহিকতা আমাদের দেশে কখনো ছিল না। হাজার বছরে এদেশের মানুষ গণতান্ত্রিক শাসনাধীন ছিলেন অল্প সময়। ইউরোপ আমেরিকার যে সব রাষ্ট্রগুলো গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থা নিয়ে গর্ব করে তাদের নারী স্বাধীনতা, কৃষ্ণাঙ্গের স্বাধীনতা, দাস প্রথা বিলুপ্তির জন্য শত শত বছর অপেক্ষা করতে হয়েছে। শত আন্দোলন সংগ্রাম ত্যাগ তিতীক্ষার পরও পূর্ণাঙ্গ রূপ এসবের মুক্তি মিলেনি। সে হিসেবে আমাদের গণতন্ত্রের ইতিহাস দীর্ঘ নয়। গণতন্ত্র ও মানবাধিকার কোন গাছের কূল নয় যে, টুপ করে পড়লো আর আপনি খেয়ে চলে গেলেন। গণতন্ত্র হলো ধারাবাহিক চর্চার বিষয়, যা আমাদের নানা কারণে হয়ে উঠেনি। গণতন্ত্রকে আমাদের দেশে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়া সত্যিই কঠিন কিন্তু অসম্ভব নয়। রবীন্দ্রনাথের ভাষায় বলতে চাই ‘সত্য যে কঠিন, কঠিনের ভালোবাসিলাম,/ সে কখনো করে না বঞ্চনা।/ মানবাধিকার কার্যকর করতে হলে কমিশনের নিজস্ব আদালত থাকতে হবে। ভারতসহ পৃথিবীর অনেক দেশে মানবাধিকার কমিশনের নিজস্ব আদালত রয়েছে। কমিশনের চেয়ারম্যানের পদমর্যদা একজন আপিল বিভাগের বিচারপতির সমান। চাইলে এসব কিছু আমরা অনুসরণ করতে পারি। কিন্তু কমিশনে যোগ্য ও নিরপেক্ষ লোক নিয়োগ করতে না পারলে কোন সুফল আসবে না। যেসব দেশে কমিশনের আদালত নেই সেসব দেশে মানবাধিকার কমিশন জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে পারে না, এই দায়িত্ব সাংবিধানিক ভাবে সর্বোচ্চ আদালতের। কমিশন শুধু মানবাধিকার লঙ্ঘিত হলে সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণ ও অত্যাচারিত ব্যক্তিকে আইনী সহায়তা দিতে পারে। গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে সরকার ও কমিশন মেলবন্ধন হিসেবে কাজ করে। প্রকৃতপক্ষে কেউ কারো প্রতিপক্ষ বা শত্রু নয়। দুটি প্রতিষ্ঠানের লক্ষ্য গণতন্ত্রকে সুদৃঢ় করা।
লেখক: কলাম লেখক, রাজনীতিক।