• সাহিত্য

    জগৎ জননী মা দূর্গা: শ্রীমান মুকুন্দ ভক্তি দাস ব্রহ্মচারী

      প্রতিনিধি ২০ অক্টোবর ২০২৩ , ১০:২৩:৩০ প্রিন্ট সংস্করণ

    শ্রীমান মুকুন্দ ভক্তি দাস ব্রহ্মচারী : আমরা সকলেই ‘দুর্গা’ দেবীর সঙ্গে পরিচিত; বাঙ্গালীর আবহমান কাল হতে এই পূজা প্রত্যক সনাতনী গৃহে ,মন্ডপে হয়ে আসছে, এই ‘দুর্গা’দেবীকে ভগবান নারায়ণের শক্তি বলে বৈদিক শাস্ত্রের বিভিন্ন স্থানে উল্লেখ করা হয়েছে। চন্ডী, দেবী ভাগবতাদিতে ‘বিষ্ণশক্তি’ ‘নারায়নী’ ইত্যাদি শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে।

    সৃষ্টির প্রথম জীব ব্রহ্মার কথায় ভগবান অনন্ত শক্তিময়; তবে জড়া বা অপরা প্রকৃতি ও পরা প্রকৃতি রূপে তা বিদ্যমান। মূলতঃ দুটি শক্তি; এই জড়া প্রকৃতি হচ্ছে অনন্ত কোটি ব্রহ্মান্ড। ঠিক যেন এক থলি ‘সরিষা’র মত। এক একটি ব্রহ্মান্ডকে এক একটি সরিষার দানার সঙ্গে তুলনা করা যায়।




    বৈদিক শাস্ত্রের বিবেচনায় এক একটি ব্রহ্মান্ডে আবার চৌদ্দটি ভুবন রয়েছে–ভূলোক, ভূবলোক, স্বলোক, মহলোক, জনলোক, তপলোক, সত্যলোক বা ব্রহ্মলোক–এগুলি উপরদিকে রয়েছে; আর নীচের দিকে রয়েছে–অতল, বিতল, সুতল, মহাতল, তলাতল, রসাতল, পাতাল বা নিম্নলোক।

    এইভাবে চৌদ্দ ভুবনাময় এই জগৎকে দেবীধাম বলে; দুর্গাদেবী হচ্ছেন, এই দেবীধামের ‘অধিষ্ঠাত্রী’–যিনি দশভুজা, সিংহবাহিণী ও পাপদমনী। তিনি মহিষাসুরকে বধ করেছেন। তার এক পাশে জড় ঐশ্বর্য রূপ লক্ষ্মী ও অন্যদিকে জড়বিদ্যারূপ সরস্বতী বিরাজ করছেন। তার একদিকে শোভারূপ কার্তিক, অন্যদিকে সিদ্ধিরূপ গণেশ রয়েছেন। পাপ দমনের উদ্দেশ্যে বেদে উল্লেখিত নানা রকম ধর্মরূপ কুড়ি প্রকার দিব্য অস্ত্রে তিনি সুসজ্জিতা।

    সৃষ্টির প্রথম জীব ব্রহ্মা ভগবান শ্রীহরির ভজনায় সিদ্ধি লাভ করে অর্থাৎ ভগবদ্ দর্শন লাভ করবার পর তিনি যখন শ্রীকৃষ্ণের বন্দনা গান করেন, তাকে ‘ব্রহ্মসংহিতা’ বলে; যাই হোক, ব্রহ্মসংহিতায় উল্লেখ করা হয়েছে–





    সৃষ্টিস্থিতিপ্রলয়সাধনশক্তিরেকা
    ছায়েব যস্য ভুবনানি বিভর্তি দুর্গা।
    ইচ্ছানুরূপমপি যস্য চ চেষ্টতে সা
    গোবিন্দমাদিপুরুষং তমহং ভজামি ॥
    অর্থাৎ স্বরূপ শক্তি বা চিৎ শক্তির ছায়া স্বরূপা প্রাপঞ্চিক জগতের সৃষ্টি স্থিতি প্রলয় সাধিনী মায়াশক্তিই ভুবন পূজিতা ‘দুর্গা’; তিনি যাঁর ইচ্ছানুরূপ চেষ্টা করেন, সেই আদি পুরুষ গোবিন্দকে আমি ভজনা করি।

    চিজ্জগতে যে দুর্গাদেবী আছেন–তিনি চিন্ময়ী কৃষ্ণদাসী। সেই দুর্গাদেবীর ছায়ারূপিনী হচ্ছেন এই জড় জগতে পূজিতা দুর্গাদেবী। পরমেশ্বর ভগবান আদি-পুরুষ গোবিন্দের ইচ্ছানুযায়ী দুর্গাদেবী ও শম্ভু একসঙ্গে কাজ করেন।

    এই শম্ভু ও কৃষ্ণ অভেদ হলেও তাদের মধ্যে পার্থক্য আছে; তা হচ্ছে শম্ভুর ঈশ্বরতা আদিপুরুষ গোবিন্দের ঈশ্বরতার অধীন। একটি উদাহরণের সাহায্যে সৃষ্টিকর্তা ব্রহ্মা তা বিশ্লেষণ করেছেন, তিনি বলেছেন কৃষ্ণকে যদি দুধের সঙ্গে তুলনা করা হয়, তবে শম্ভুকে দধির সঙ্গে তুলনা করা যেতে পারে। এই শম্ভু হচ্ছেন পরম বৈষ্ণব; তাই শাস্ত্রে বলা হয়েছে–
    “বৈষ্ণবানাং যথা শম্ভু।”





    শ্রীমদ্ভগবদ্গীতায় ভগবান শ্রীকৃষ্ণ অর্জুনকে বলেছেন–
    দ্বৌ ভূতসর্গৌ লোকেহস্মিন্ দৈব আসুর এব চ ॥
    অর্থাৎ, এই জগতে দু’রকম জীব রয়েছে, এক হচ্ছে দৈব গুণসম্পন্ন, আর এক ধরনের জীব হচ্ছে আসুরিক সম্পন্ন। এদের মধ্যে যারা শ্রীভগবানের আনুগত্য স্বীকার করেন না, তাদের বলা হয় অসুর; তারা সবসময় নিজেই ভোক্তা ও কর্তা হতে চায়, ভগবানের কর্তৃত্ব তারা স্বীকার করে না। অথচ সকল শাস্ত্রগ্রন্থাদি থেকে আমরা জানি ভগবানই প্রধান কর্তা ও সমস্ত কিছুর ভোক্তা। ভগবদ্গীতায় ভগবান শ্রীকৃষ্ণ বলেছেনঃ
    ভোক্তারং যজ্ঞতপসাং সর্বলোকমহেশ্বরম্।
    সুহৃদং সর্বভূতানাং জ্ঞাত্বা মাং শান্তিমৃচ্ছতি ॥

    –রাজা যেমন তার রাজ্যে এক কারাগার তৈরী করেন; যারা রাজার নির্দেশ অমান্য করে তার কৃর্তত্ব স্বীকার করেন না; তাদের স্থান হয় কারাগারে; ঠিক সেই রকম যারা ভগবানের নির্দেশ মানে না, যারা শাস্ত্র মানে না, তাদের কারাগাররূপ এই জড় জগতে আসতে হয়। কারাগারে দুঃখ-দুর্দশা রূপ শাস্তি ভোগ করতে হয়, তাই ভগবান এই জগৎকে ভগবদ্গীতায় বলেছেন–‘দুঃখালয়ম্’। এই জগতে দুঃখ-দুর্দশা সকলকেই ভোগ করতে হবে। কেউ তা এড়াতে পারবে না। তাই শ্রীল সনাতন গোস্বামী শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুকে জীবের আদর্শ প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করেছিলেন–

    ‘কে আমি, কেনে মোরে জারে তাপত্রয়?’ (চৈঃ চঃ মধ্য ২/১০২)
    অর্থাৎ, আমার স্বরূপ কি? কেন এই ভব সংসারে আমাদের ‘তাপত্রয়’ অর্থাৎ তিন রকম দুঃখ তাপ ভোগ করতে হচ্ছে? এই তিন রকম দুঃখ কি কি? শাস্ত্রে তাও উল্লেখ করা হয়েছে; এগুলো হচ্ছে আধ্যাত্মিক, আধিদৈবিক ও আধিভৌতিক। সর্বোচ্চ লোক থেকে সর্বনিম্ন লোক পর্যন্ত এই জড় জগতে জন্ম-মৃত্যুময় দুঃখ-দুর্দশায় পরিপূর্ণ। এমনকি সমগ্র জীবকুলের মধ্যে এই জড় জগতের ব্রহ্মাও জন্ম, মৃত্যু, জরা ও ব্যাধি থেকে মুক্ত নয়। এই বিষয়ে ভগবান কৃষ্ণ ভগবদ্গীতায় একটি শ্লোকে (৮/১৬) সুন্দরভাবে বিশ্লেষণ করেছেন–




    “আব্রহ্মভুবনাল্লোকাঃ পুনরাবর্তিনোহর্জুনঃ।”
    কিন্তু যারা কৃষ্ণানুশীলন করে কৃষ্ণকে লাভ করে তারা কৃষ্ণের ধামে যায়, সেখানে জীবন নিত্য জ্ঞান ও আনন্দে পূর্ণ। শুদ্ধ কৃষ্ণভক্ত সদ্গুরুর অনুগত্যে, নিরপরাধে, নিষ্কপটে ও সম্বন্ধ জ্ঞানের সঙ্গে মহামন্ত্র সর্বদা কীর্তন করা উচিত।
    হরে কৃষ্ণ হরে কৃষ্ণ কৃষ্ণ কৃষ্ণ হরে হরে।
    হরে রাম হরে রাম রাম রাম হরে হরে ॥

    –শুদ্ধ কৃষ্ণভক্ত সঙ্গে হরিনাম কীর্তনই এ যুগের ধর্ম।
    ভগবান কৃষ্ণ ভগবদ্গীতায় অর্জুনকে বলেছেন–‘জাতস্য হি ধ্রুবো মৃত্যুর্ধ্রুবং জন্ম মৃতস্য চ’। অর্থাৎ, এই জড় জগতে জন্ম হলে জীবরে মৃত্যু নিশ্চিত। আবার মৃত্যুর পর আবার জন্ম অনিবার্য। তার মধ্যে সমগ্র জীবকুলকে রোগ, শোক, জরা, ব্যাধি ভোগ করতে হয়। এগুলো থেকে কোন জীবেরই রেহাই নেই। তবে যারা ভগবান কৃষ্ণের চরণে প্রপত্তি করেন কৃষ্ণের শরণাপন্ন হন, তারা এই সব দুঃখতাপ থেকে মুক্তি লাভ করেন, যারা শুদ্ধ কৃষ্ণানুশীলনে দিনের ২৪ ঘন্টায় এইভাবে নিমগ্ন তারা জীবনমুক্ত পুরুষ।




    যারা ভগবান কৃষ্ণের আনুগত্য স্বীকার করে না, যারা অসুর তাদের এই কারাগার রূপ ‘দুর্গ’ থেকে জন্ম মৃত্যুময় আবর্ত থেকে বের হয়ো অতীব কঠিন। এই কারাগারের, এই জড় জগতের অধিষ্ঠাত্রী দুর্গাদেবী তাই এইসব কৃষ্ণদ্বেষী অসুরদেরকে ত্রিশূল দ্বারা আঘাত করেন অর্থাৎ তারা ত্রিতাপা জ্বালা ভোগ করে–মানসিক, দৈব ও অন্য জীব থেকে দুঃখ ভোগ করে; যেমন একান্ত প্রিয়জনের বিয়োগ জনিত দুঃখ, বজ্রপাত, ভূমিকম্প, প্লাবন, মড়কাদির ফলে, দুঃখতাপ, সর্পাঘাত বা অন্য জীব থেকে প্রাপ্ত জ্বালাযন্ত্রণা তাদের ভোগ করতে হয়।

    ভগবান হচ্ছেন ‘স্বরাট’; কৃষ্ণ সম্পূর্ণ স্বাধীন; জীব ভগবানের অংশ হওয়ায় তারও স্বতন্ত্রতা রয়েছে; ভগবান হচ্ছেন বিভু, কিন্তু জীব হচ্ছেন অণু তবে স্বতন্ত্রতা সামান্য মাত্র, জীবন যখন তার স্বতন্ত্রতার সদ্ব্যবহার করে, তখন সে কৃষ্ণোন্মুখ হয়, আর যখন সে স্বতন্ত্রতার অপব্যবহার করে, তখন সে কৃষ্ণবর্হিমুখ হয়।

    এই জড় জগতে জীবমাত্রই কৃষ্ণবহির্মুখ হয়ে ভোগ বাঞ্চা করে; তারা দুর্গাদেবীর পূজা করে; তারা দেবীর কাছে ‘ধনং দেহি, রূপং দেহি, যশো দেহি’ ইত্যাদি প্রার্থনা করে; এইভাবে জীবকুল জড়জগতে নিক্ষিপ্ত হয়, তখন দুর্গাদেবী যে বর দেন, যেগুলি কিন্তু তার কপট কৃপা।
    “দৈবী হ্যেষা গুণময়ী মম মায়া দুরত্যয়া।
    মামেবা যে প্রপদ্যন্তে মায়ামেতাং তরন্তি তে ॥”




    অর্থাৎ, ভগবানের দিব্য দুরতিক্রম্য মায়াকে তার শরণাগতর জন্যই অতিক্রম করতে পারে। আর অন্য কেউ তা পারে না। কলিযুগে হরিনাম ছাড়া এই মায়াকে অতিক্রম করবার আর কোন উপায় নেই। তাই শাস্ত্রে বলা হয়েছে–কীর্তনীয়ঃ সদা হরিঃ; আবার বলা হয়েছে– হরের্নাম হরের্নাম হরের্নামৈব কেবলম্।
    কলৌ নাস্ত্যেব নাস্ত্যেব নাস্ত্যেব গতিরন্যথা ॥

    –এই শিক্ষাই কলিযুগপাবনাবতারী শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু জগৎকে দিয়েছেন। কলিযুগে অন্য কোন পন্থা কার্যকর নয়, কেবল শ্রীহরি নামের শ্রবণ কীর্তন স্মরণেই সর্বসিদ্ধি লাভ হয়। এই হল সর্ব-শাস্ত্রের মত।
    অনেক সৌভাগ্যের ফলে শুদ্ধ কৃষ্ণ ভক্ত সঙ্গের ফলে জীবের কৃষ্ণবহির্মুখ ভাব দূর হয়; কৃষ্ণভক্তের সান্নিধ্যে জীব তখন ভগবানের শরণাগত হয়। দুর্গাদেবী তখন তুষ্ট হন। তাই আমরা নিত্য ভগবানের দিব্য নামের আশ্রয় গ্রহণ করে বৈদিক শ্রাস্ত্রের শিক্ষায় পরিচালিত হয় তাহলে এই জীবন শেষে নিত্য ভগবদ ধামে গমন করতে পারবো।

    কৃষ্ণ ভক্ত সঙ্গের ফলে জীবের কৃষ্ণবহির্মুখ ভাব দূর হয়; কৃষ্ণভক্তের সান্নিধ্যে জীব তখন ভগবানের শরণাগত হয়। দুর্গাদেবী তখন তুষ্ট হন। তাই আমরা নিত্য ভগবানের দিব্য নামের আশ্রয় গ্রহণ করে বৈদিক শ্রাস্ত্রের শিক্ষায় পরিচালিত হয় তাহলে এই জীবন শেষে নিত্য ভগবদ ধামে গমন করতে পারবো।




    শ্রীমান মুকুন্দ ভক্তি দাস ব্রহ্মচারী
    যুগ্ম সম্পাদক
    ইসকন নন্দনকানন ,চট্টগ্রাম।
    পরিচালক ,শ্রী গদাধর পন্ডিত ধাম , বাঁশখালী,চট্টগ্রাম।