মোঃ আলামিন হোসেন, তাড়াশ উপজেলা প্রতিনিধি: শীতের মিঠে রোদ আর কুয়াশাচ্ছন্ন ভোরের হাতছানি নিয়ে প্রকৃতিতে লেগেছে শীতের ছোঁয়া। আর এই ঋতু পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গেই সিরাজগঞ্জের তাড়াশ উপজেলায় শুরু হয়েছে এক চিরায়ত লোকউৎসবের প্রস্তুতি – খেজুর রস সংগ্রহ। দিনের বেলায় সূর্যের কোমল তেজ থাকলেও, রাতের শেষে মৃদু ঠাণ্ডা আর ভোরের ঘন কুয়াশা স্পষ্ট জানান দিচ্ছে যে শীতকাল দরজায় কড়া নাড়ছে। প্রকৃতির এই আমেজকে বরণ করে নিতে গ্রামের পথে-প্রান্তরে এখন গাছিদের কর্মব্যস্ততা তুঙ্গে।
উপজেলার বিভিন্ন গ্রাম ঘুরে দেখা যায়, খেজুর গাছের মগডালে গাছিদের নিপুণ হাতের ছোঁয়া। তারা অত্যন্ত যত্নের সঙ্গে খেজুর গাছের ডালপালা ও আগার অংশ পরিষ্কার করছেন, যা স্থানীয় ভাষায় 'কাম দেওয়া' নামে পরিচিত। এই প্রক্রিয়ার পর গাছের মাথার দিকের সাদা অংশটি প্রস্তুত করা হয়। এরপর তা শুকিয়ে পুনরায় কেটে সেখানে সাবধানে 'নলি' বসানো হয়, যার মাধ্যমে ফোঁটা ফোঁটা করে ঝরে পড়বে প্রকৃতির এক অনবদ্য দান—মিষ্টি খেজুর রস। এই রস যেমন কাঁচা অবস্থায় পান করতে অসাধারণ, তেমনি জ্বাল দিয়ে তৈরি হয় লোভনীয় ও সুগন্ধী গুড়, যা শীতের সকালে বাঙালির এক ঐতিহ্যবাহী উপাদেয়।
নওগাঁ ইউনিয়নের এক অভিজ্ঞ গাছি জানান, সাধারণত কার্তিক মাস থেকেই গাছ প্রস্তুতের কাজ শুরু হয়ে যায়। তবে এ বছর শীত কিছুটা আগেভাগেই অনুভব হওয়ায় গাছিরাও সময়ের আগেই তাদের প্রস্তুতি পর্ব শুরু করেছেন। একটি গাছ রস সংগ্রহের জন্য সম্পূর্ণ প্রস্তুত করতে প্রায় সারাদিন লেগে যায়। রস সংগ্রহের জন্য গাছিরা ৬ থেকে ১০ লিটার ধারণক্ষমতার মাটির হাঁড়ি ব্যবহার করেন। রস যাতে তাজা থাকে সেজন্য অনেক গাছি হাঁড়ির ভেতরে চুনের প্রলেপ দেন, তবে যারা কাঁচা রসের আসল স্বাদ উপভোগ করতে চান, তাদের জন্য ব্যবহৃত হাঁড়িতে চুন দেওয়া হয় না।
শীতকালে খেজুর রস আর গুড় বাঙালির সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। এই মিষ্টি রস আর গুড় দিয়েই তৈরি হয় বাহারি পিঠা-পুলি, মজাদার পায়েস আর নানা প্রকার মিষ্টান্ন।