মো. রমিজ আলী, সীতাকুণ্ড প্রতিনিধি: কুকুর, বিড়ালসহ বিভিন্ন বেওয়ারিশ ও বন্যপ্রাণীর কামড় ও আঁচড়ে প্রাণঘাতী জলাতঙ্ক রোগের ঝুঁকি দিন দিন ভয়াবহ আকার ধারণ করছে। সময়মতো চিকিৎসা না নিলে এই রোগে আক্রান্ত ব্যক্তির মৃত্যুঝুঁকি শতভাগ। এমন প্রেক্ষাপটে সীতাকুণ্ডে জলাতঙ্ক প্রতিরোধে জনসচেতনতা বৃদ্ধি ও প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা জোরদারে ব্যাপক কর্মসূচি গ্রহণ করেছে উপজেলা স্বাস্থ্য বিভাগ ও প্রাণিসম্পদ বিভাগ।
সীতাকুণ্ড উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের ইনচার্জ (টিএইচও) ডা. আলতাফ হোসেন বলেন, বর্তমানে উপজেলার বাজারঘাট, রাস্তাঘাট ও বসতবাড়ির আশপাশে বেওয়ারিশ কুকুর ও বিড়ালের সংখ্যা উদ্বেগজনক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। পাশাপাশি পাহাড়ি ও বনাঞ্চল এলাকায় শিয়াল, বানর ও বেজিসহ বিভিন্ন বন্যপ্রাণীর বিচরণ রয়েছে। এসব প্রাণীর কামড় বা আঁচড়ে জলাতঙ্ক ভাইরাস মানবদেহে সংক্রমিত হয়ে ধীরে ধীরে স্নায়ুতন্ত্র বিকল করে দেয়। এক পর্যায়ে আক্রান্ত ব্যক্তি উন্মত্ত আচরণে লিপ্ত হয়ে নিশ্চিত মৃত্যুর দিকে ধাবিত হয়।
তিনি আরও বলেন, জলাতঙ্ক প্রতিরোধে প্রথম ও প্রধান শর্ত হলো সচেতনতা। যারা কুকুর, বিড়াল বা অন্যান্য প্রাণী লালন-পালন করেন, তাদের অবশ্যই নির্ধারিত সময় অনুযায়ী জলাতঙ্কের টিকা দিতে হবে। সরকারি উদ্যোগে চলতি সপ্তাহ থেকেই উপজেলার প্রতিটি গ্রামে কুকুর ও বিড়ালের জন্য বিনামূল্যে জলাতঙ্ক টিকাদান কর্মসূচি শুরু করা হচ্ছে। এ কর্মসূচি সফল করতে সকল শ্রেণি-পেশার মানুষের সহযোগিতা কামনা করেন তিনি।
রবিবার (১১ জানুয়ারি) সকাল ১১টায় সীতাকুণ্ড উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের মিলনায়তনে ডা. আলতাফ হোসেনের সভাপতিত্বে আয়োজিত জনসচেতনতামূলক সভায় প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন সহকারী কমিশনার (ভূমি) মো. আব্দুল্লাহ আল মামুন। বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখেন জলাতঙ্ক বিষয়ক সুপারভাইজার মোক্তার উদ্দিন, উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা কল্লোল বড়ুয়া, উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা গোলাম রহমান চৌধুরী, সীতাকুণ্ড মডেল থানার ইন্সপেক্টর (ইন্টেলিজেন্স) মো. ইউনুছ এবং সীতাকুণ্ড প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক আব্দুল্লাহ আল কাইয়ুম চৌধুরী।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে এসি (ল্যান্ড) মো. আব্দুল্লাহ আল মামুন বলেন, বেওয়ারিশ কুকুর ও বিড়াল জলাতঙ্ক রোগ বহনের অন্যতম উৎস। এসব প্রাণী থেকে নিরাপদ থাকতে হলে সতর্কতার পাশাপাশি আক্রান্ত ব্যক্তিকে দ্রুততম সময়ে জলাতঙ্কের টিকা গ্রহণ করতে হবে। একই সঙ্গে নিজ নিজ এলাকায় প্রাণীদের টিকাদান নিশ্চিত করতে সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণের আহ্বান জানান তিনি। স্বাস্থ্য বিভাগের এই সময়োপযোগী উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়ে সার্বিক সহযোগিতার আশ্বাস দেন তিনি।
সভায় জলাতঙ্ক বিষয়ক সুপারভাইজার মোক্তার উদ্দিন জলাতঙ্ক আক্রান্তের চিকিৎসা পদ্ধতি বিস্তারিতভাবে তুলে ধরেন। তিনি বলেন, প্রাণীর আক্রমণের ধরন অনুযায়ী আক্রান্তদের তিনটি ক্যাটাগরিতে ভাগ করে চিকিৎসা দেওয়া হয়। ক্যাটাগরি–১ এ আঁচড়, লেহন বা সংস্পর্শে কোনো ক্ষত না থাকলে টিকা প্রয়োজন হয় না, তবে আক্রান্ত স্থান অন্তত ১৫ মিনিট পরিষ্কার পানি ও সাবান দিয়ে ভালোভাবে ধুয়ে ফেলতে হবে। ক্যাটাগরি–২ এ ক্ষত থাকলেও রক্তপাত না হলে অ্যান্টি রেবিস ভ্যাকসিন (ARV) গ্রহণ করতে হবে। আর ক্যাটাগরি–৩ এ গভীর ক্ষত ও রক্তপাত হলে আক্রান্ত ব্যক্তিকে ARV-এর পাশাপাশি রেবিস ইমিউনোগ্লোবুলিন (RIG) নিতে হবে। নিয়ম মেনে নির্ধারিত সময় অনুযায়ী চিকিৎসা গ্রহণ করলে জলাতঙ্ক থেকে সম্পূর্ণ সুরক্ষা পাওয়া সম্ভব বলে তিনি জানান।
সভায় বক্তারা আরও বলেন, জলাতঙ্ক একটি শতভাগ প্রতিরোধযোগ্য রোগ। এজন্য প্রয়োজন সম্মিলিত সচেতনতা, সময়মতো টিকাদান এবং সরকারি কর্মসূচিতে সক্রিয় অংশগ্রহণ। এসব উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে সীতাকুণ্ডকে জলাতঙ্কমুক্ত উপজেলা হিসেবে গড়ে তোলা সম্ভব হবে।